তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল : “জরুরী রপ্তানি কাজে নিয়োজিত” ইংরেজিতে “অন ইমারজেন্সি এক্সপোর্ট ডিউটি” ! কত সুন্দর লাগে না কথাটি ! কত মধুর একটি শব্দ “রপ্তানী”, আহা ঠিক এই জিনিসটা বেড়ে গেলে বাংলাদেশের সমৃদ্ধি রোখে সাধ্য আছে কার! ভাবছেন কেন লিখছি এ কথা? আসছি। তার আগে আরও কয়েকটি ভাল লাগার বিষয় বলে নিই। বড্ড ভাল লাগে যখন সাধারণ একটি মাইক্রোবাসের গায়ে লেখা থাকে অ্যাম্বুলেন্স! তাইনা! অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালাতে কিছু নিয়মকানুন নিশ্চয় আছে, আবার পয়সা বাঁচানোর মূলা ঝুলিয়ে ঠিক মুড়ির টিনের মত ছোট আকৃতির অ্যাম্বুলেন্স নামধারী গাড়ী যখন চোখের সামনে দিয়ে যায়, রোগী বেচারার কথা চিন্তা করলেই নিঃশ্বাস আটকে আসে। তবে আমাদের ঢাকা শহরে এ খুব কার্যকরী কারণ এখানে যে হারে জ্যাম, যত অলিগলি সব ছাপিয়ে এই পঙ্খিরাজ গন্তব্যে পৌঁছায় সময়ে। বাবা-চাচার কাছে শিখেছিলাম অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস এর গাড়ী দেখলে তাদেরকে আগে যেতে দিতে হয়, রাস্তা ফাঁকা করে দিতে হয়। আর তাইতো নিজের এলাকায় সাইকেল, মোটর সাইকেল , রিক্সা যেটাতেই থাকতাম সাইরেন শুনলে থেমে আগে জায়গা করে দিতাম।

আজ সেই দিন আর নাই, সবই জরুরী হয়ে গেছে! গ্যাস কোম্পানীর একটা ছোট্ট পিকাপে লেখা থাকে “জরুরী গ্যাস সরবরাহ কাজে নিয়োজিত” যদিও জানিনা এর ভিতরে কতটা গ্যাস রয়েছে, নাকি এর লাইন হাওয়া বা অদৃশ্য, এক্ষেত্রে যদি গ্যাস লাইন মেরামতের কাজে নিয়োজিত লিখত তাও মেনে নিতাম। বাবুদের কাজ অ্যাম্বুলেন্সের চেয়েও জরুরী।
“জরুরী ওষুধ সরবরাহ কাজে নিয়োজিত” এই লেখাটি সব ঔষধ কোম্পানীর গাড়ীতে লেখা থাকে তা মানুষ বহন করুক আর ঔষধ, জরুরী অ্যাম্বুলেন্সের চেয়েও জরুরী!
বনানী থেকে নেভী হেড কোয়ার্টার ক্রস করে ফ্লাইওভার এর যে রাস্তা মাসে ২০ দিন দাঁড়ান অন্তত ১০/১২ দিন দেখবেন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গাড়ী উল্টো পথে রং সাইডে আসছে! দেশের সর্ববৃহৎ নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের বহন করছে যে গাড়ী তাতো অ্যাম্বুলেন্সের চেয়ে অবশ্যই বেশী জরুরী তাইনা! আবার দেখবেন মাঝে মাঝে একটা প্রিজন ভ্যানও ঐ একই পন্থা অবলম্বন করছে “জরুরী আসামী বহন কাজে নিয়োজিত”! উচ্চপদস্থ আমলা থেকে শুরু করে উচ্চ শ্রেণীর অনেককে এর আগে আমরা উল্টো পথে আসতে দেখেছি, কত পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছে এর আগে মনে নেই আপনার!
সরকারের বিশেষ বাহিনী যারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ কিংবা বাংলাদেশে অবস্থানরত বিভিন্ন রাষ্ট্রের অ্যাম্বাসেডরদের নিরাপত্তায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন তাদের শ্রদ্ধা জানাই।
সমস্যাটা হলো, সেদিন গুলশান ১ সিগন্যালে দেখি একটি মাইক্রো বাসের সামনের সিটে বসা এক ব্যক্তি একটি লাল আলোক দণ্ড নাড়িয়ে আর একটি বাঁশি ফুঁকিয়ে যারপরনাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আগে যাওয়ার জন্য। আমি কৌতূহলবশত একটু এগিয়ে দেখি এযে আমার প্রিয় একটি টেলিভিশন চ্যানেলের গাড়ী এটি। ভিতরে ফাঁকা। শুধু ড্রাইভার আর তার সাথে সেই ব্যক্তি। আমিতো অবাক! কত ব্যস্ততা, কত জরুরী!
সেদিন দেখি পিছন থেকে সাইরেন বাজছে আমিতো ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কোনরকম সাইড দিলেই বাঁচি কে গেলো কিছুই বুঝলাম না। একটা কালো গাড়ী কালো গ্লাস সাইরেন লাগিয়েছে অ্যাম্বুলেন্সের। যদি কোন মন্ত্রীর গাড়ী হত তবেতো একটা ফ্লাগ স্ট্যান্ড থাকতো তাইনা? সেটাও নেই। কি করবো বাবা উনারও অনেক জরুরী! কবে জানি শুনেছিলাম কালো গ্লাস আর ব্যবহার করা যাবেনা, এখন আবার শুরু হয়েছে। কিন্তু একটা জায়গায় গেলে কালো গ্লাস নামাতেই হয়, কোন জায়গায় বলবনা জেনে নেই। তখন বেশ মজা পাই। পারলে ওখানে বাবু সাইরেন বাজাও দেখি একটা রশিদ ধরিয়ে দেবে হাতে! সাদা প্রাইভেট গাড়ী তাতেও ভিস্যুয়াল ইনডিকেটর তাও আবার অ্যাম্বুলেন্সের মত এও দেখেছি। নিয়মতো কতই হচ্ছে কিছুদিন চলছে তারপর যেইকে সেই। সেই স্টিকারতো এখনো অনেক গাড়ীতে আছে মোটর সাইকেলেও। আহা বোঝেন না কেন, এসবই জরুরী যে!
আপাতত জরুরী কথা শেষ এখন আসি যা দিয়ে শুরু করেছিলাম তা! “জরুরী রপ্তানি কাজে নিয়োজিত” হ্যা পোশাক শিল্পের কর্মকর্তাদের আনা নেওয়ার কাজে নিয়োজিত গাড়ীর গায়ে এই লেখাটি লেখা থাকে। রপ্তানীতো করছে একজন কর্মকর্তাকে বাসা থেকে রপ্তানি করে ফ্যাক্টরীতে আমদানী করছে। কিন্তু আমার এক্ষেত্রে কোন নেতিবাচক মন্তব্য নেই কারণ তারা আসলেই জরুরী তারা একদিন অফিসে না যেতে পারলে প্রোডাকশনের যে পরিমাণ ক্ষতি হয় তা পূরণ করতে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। খরচও বাড়ে। বেচারা এই যে বাসা থেকে রপ্তানী হলেন, কখন যে আবার ফ্যাক্টরী থেকে বাসায় রপ্তানী হবেন তার কোন ঠিক নেই।
কদিন ধরে বন্ধু স্বজনের আহাজারির কেন্দ্রবিন্দু হল গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে টঙ্গীর রাস্তা। বেচারাদের ৫/৬ ঘণ্টা যেতে আসতে লেগে যায় আবার কখনও এক পথেই ৫/৬ ঘণ্টা! আজ এক পরিচিত প্রিয়জন লিখল তিনি সকাল ৬.৪৫ মিনিটে উত্তরার বাসা থেকে রপ্তানী হয়ে দুপুর ১২ টায় ফ্যাক্টরীতে আমদানি হন! মোটে ৫ ঘণ্টা ১৫ মিনিট, কারণ কি? কারণ জ্যাম। জ্যামের কারণ কি? মনেহয় রাস্তাটার কেউ ব্যবচ্ছেদ করেছে, বড্ড বিশ্রী ব্যবচ্ছেদ! এখানে ছাল নেই সেখানে বাকলা নেই! আর এর মধ্যে যদি বৃষ্টি আসে তাইলে তো আর কথাই নাই! রাস্তা মাঝেমাঝে ঠিক করা হলেও ঠিক কেমন ঠিক করা হচ্ছে কি তার মান তাতো বলতে পারবোনা কিন্তু এ রাস্তা এক নাগারে বেশ কিছুদিন ভাল থাকে এর নজীর কম। বিশেষ করে বর্ষাকালে। মাঝে মাঝে দেখা যায় মেরামতের জন্য বিটুমিন আর পাথর হাজির। আবার এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই আবার যেই কে সেই।
আমার কথা সেটা নয় সেটা দেখার অনেকে আছেন, তারা আমার চেয়ে অনেক বিজ্ঞ। কিন্তু আমরা কি কখনো হিসেব করেছি এই রাস্তার কারণে , এই জ্যামের তথা বিলম্বের কারণে কত শ্রম ঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, কিংবা অর্থ নষ্ট হচ্ছে। বেচারাদের ছুটির পর বাড়ী ফেরার যে সময় তা নাহয় নাই ধরলাম কিন্তু তাদের অফিস শুরু হয় ৮ টা থেকে। অধিকাংশ পোশাক শিল্প কারখানা আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ভালুকা এই অঞ্চলগুলোতে অবস্থিত।
সব দিক গুলো বাদ দিয়ে যেদিকের আলাপ করছি তা নিয়ে একটু হিসাব করা যাক। প্রতিদিন সকালে কমপক্ষে ৩০০/৪০০ গাড়ী পোশাকশিল্প কর্মকর্তাদের বাসা থেকে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা, কিংবা ময়মনসিংহ ভালুকার পথে নিয়ে যাত্রা শুরু করে। একেকটি গাড়ীতে থাকেন ১০/১১ জন কর্মকর্তা (শুধু মাইক্রোবাসের হিসাব করলে) । প্রতিটি গাড়ীতে অন্ততপক্ষে একজন জিএম, ২ জন ম্যানেজার, ৭/৮ জন এক্সিকিউটিভ থাকে। একজন জিএম ন্যুনতম মাসে ১,০০,০০০ ( এক লক্ষ টাকা) বেতন পান সে হিসাবে তার একদিনের বেতন হচ্ছে ৩৮৮৬ টাকা যা ঘণ্টায় ৪৮১ টাকা প্রায় ধরি ৩০০ গাড়ীতে ৩০০ জিএম থাকলে তাদের সকলের একঘণ্টার মজুরী হচ্ছে ১,৪৪,৩০০ ( এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার তিনশত টাকা মাত্র)।ধরি গড়ে আজ ১৯ জুলাই ২০১৭ তারিখে সবার প্রায় ৪ কর্মঘণ্টা জ্যামের কারণে নষ্ট হল মোট আসছে ৫,৭৭,২০০ (পাঁচ লক্ষ সাতাত্তর হাজার দুইশত টাকা মাত্র) ঠিক ম্যানেজারদের মাসিক ন্যুনতম ৫০,০০০(পঞ্চাশ হাজার টাকা) ধরলে আসছে ৪ ঘণ্টায় ৫,৭৬,৯২৩ আর এক্সিকিউটিভ দের ২৫,০০০ ধরে আসছে ১১,৫৩,৮৪৬। সর্বমোট আজ ৩০০ গাড়ীর হিসাব ধরলে শ্রম ঘণ্টা অপচয়ের ফলে সর্বমোট আর্থিক ক্ষতি হল ২৩,০৭,৯৬৯। এর সাথে সাধারণ পরিবহনে যারা বিভিন্ন গন্তব্যে যাচ্ছে তাদের সকলের ক্ষতির হিসাব! কম করেই ধরে হিসাব করেন। আবার বেচারারা ট্যাক্সও দিচ্ছে!
সবেচেয়ে পরিতাপের বিষয় যে সময়টা পথে নষ্ট হল তাতো আবার পুষিয়ে দেয়ার জন্য ওভারটাইম সহ অনেক পন্থা রয়েছে সেওতো খরচ তাইনা? এই বেচারারা বাসা থেকে যখন বের হয় তখনও বাচ্চা ঘুমিয়ে থাকে আর বাসায় যখন ফেরেন তখনো বাচ্চা ঘুমোয়। এ নিয়ে তারা কারও কাছে কখনো কোন অভিযোগ করেনি। তাদের বেতন পরিশোধের আগেই কোম্পানী কিন্তু ট্যাক্স ঠিকই কেটে নেয়! তারাওতো রাষ্ট্রকে কিছু দিচ্ছে, আমরা কি এই রাস্তার ঝামেলাটা মিটিয়ে তাদের একটু শান্তি দিতে পারিনা? যেন একটু আগে বাসা পৌছিতে পারে, যদি বাচ্চাটা জেগে থাকে একনজর দেখতে পারে।
লেখক:সহ-সম্পাদক, আরএমজি টাইমস
মতামত লিখুন :