এম, এ মান্নান পাভেল
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প (RMG sector) দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। প্রায় ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক এই খাতে সরাসরি কর্মরত এবং আরও কয়েক লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং নারীর কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই এই শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। তবে এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি স্থিতিশীল কর্মসংস্থান ব্যবস্থা।
স্থিতিশীল কর্মসংস্থান ব্যবস্থা বলতে এমন একটি কাঠামোকে বোঝায় যেখানে শ্রমিকরা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, নিয়মিত আয়, ন্যায্য সুবিধা এবং স্বচ্ছ চাকরির নিশ্চয়তা পান। অর্থাৎ, কাজ থাকবে ধারাবাহিক, আয় হবে পূর্বানুমানযোগ্য এবং চাকরির নিরাপত্তা থাকবে নিশ্চিত।
পোশাক শিল্পে এই ব্যবস্থার অভাব থাকলে শুধু শ্রমিক নয়, পুরো উৎপাদন ব্যবস্থাই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
বর্তমানে পোশাক শিল্পে অনেক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান কাঠামো এখনো সম্পূর্ণ স্থিতিশীল নয়। এর কিছু বাস্তব চিত্র হলো—
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি কারখানায় ইউরোপের বড় অর্ডার থাকলে ৩ শিফটে কাজ চলে, কিন্তু অর্ডার শেষ হলে হঠাৎ কাজের চাপ কমে যায় এবং শ্রমিকদের আয়ও কমে যায়। এই অনিশ্চয়তা থেকেই কর্মসংস্থান অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
যখন একজন শ্রমিক জানেন তার চাকরি নিরাপদ, তখন তিনি বেশি মনোযোগ ও দক্ষতার সাথে কাজ করেন। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
দীর্ঘমেয়াদি চাকরি থাকলে শ্রমিকরা প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী হন এবং দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।
কর্মসংস্থান স্থিতিশীল হলে শ্রমিক-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক উন্নত হয়, যা শিল্পে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে।
পোশাক শিল্প সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক মন্দা বা চাহিদা কমলে সরাসরি প্রভাব পড়ে।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কাঁচামালের দাম বাড়ায় অনেক কারখানা খরচ কমাতে কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
আধুনিক প্রযুক্তির অভাব থাকায় উৎপাদন দক্ষতা কমে যায়, যা স্থায়ী কর্মসংস্থানের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
অনেক কারখানায় দীর্ঘমেয়াদি HR পরিকল্পনা না থাকায় হঠাৎ করে শ্রমিক নিয়োগ বা ছাঁটাই করা হয়।
প্রতিটি কারখানায় ১–৩ বছরের মানবসম্পদ পরিকল্পনা থাকা জরুরি, যাতে অর্ডার ওঠানামা হলেও কর্মসংস্থান স্থিতিশীল থাকে।
শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিলে তারা শুধু একটি লাইনে নয়, একাধিক কাজে দক্ষ হতে পারবেন। এতে কাজের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
শুধু একটি ধরনের অর্ডারের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন প্রোডাক্ট লাইনে কাজ করলে ঝুঁকি কমে।
বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি ব্যবস্থা শ্রমিকদের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
ডিজিটাল হাজিরা, বেতন ব্যবস্থা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু করলে অনিশ্চয়তা কমে আসে।
পোশাক শিল্প শুধু একটি রপ্তানি খাত নয়, এটি বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং স্থিতিশীল কর্মসংস্থান ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি।
শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ, পূর্বানুমানযোগ্য এবং মানবিক কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে পারলেই এই শিল্প দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
মতামত লিখুন :