Logo

একজন লেখকের আত্মকথা

RMG Times
মঙ্গলবার, অক্টোবর ৪, ২০১৬
  • শেয়ার করুন

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল : লেখক, তিন অক্ষরের একটি শব্দ! শব্দটা আমরা বহুভাবে বহুবার ব্যবহার করে থাকি। এই একটি শব্দে যাদের পরিচয় নিহীত তার মনের মাঝে যে কত লক্ষ লক্ষ শব্দ খেলা করছে তার খবর কেইবা রাখে! একজন লেখকের কাছে তার প্রতিটি লেখা আপন সন্তানের মত। কোনটা কখনোই সে খাঁটো করে দেখেনা- তার আপন সন্তান যে! কোন লেখা লিখতে সময় লাগে ৫ মিনিট, কোনটা ঘণ্টা, কোনটা দিন,  কোনটা মাস! আবার এমনও লেখা আছে যা তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়েও শেষ করতে পারেনা। এটি তার জন্য বড়ই কষ্টকর একটা অনুভূতি। লেখক যখন একটি লেখা লেখেন তিনি আত্মসন্তুষ্টি না পাওয়া পর্যন্ত তা শেষ করেন না, লেখার কোন জায়গায় কারও কাছে দেয়ার আগে তিনি নিজে তা যে কতশত বার পড়েন , পরিবর্তন পরিমার্জন করেন তারই বা খবর কে রাখে! একজন লেখকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হল যখন তার লেখা পাঠক সমাজে প্রকাশিত হয়। তার যেকোন লেখা যখন কোন গণমাধ্যম কিংবা প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত হয় তার মনে হাজারও শঙ্কা কাজ করে, পাঠকদের কেমন লাগবে? তারা গ্রহণ করবে তো? আবার মনে একটা স্বপ্নেরও জন্ম নেয় দিবালোকে তিনি জেগে স্বপ্ন দেখেন সকলের বাহবা পাচ্ছি, দু চারটে পুরুস্কার, অধিক পাঠক লেখা পড়ছে বা বই কিনছে ইত্যাদি হাজার রঙের স্বপ্ন। বিশ্বাস করুন ঠিক সেই সময়টা সে কখনো অর্থ প্রাপ্তির কথা চিন্তা করেন না। কখনো লোভ করেন না কিন্তু স্বপ্ন দেখেন! আর তার স্বপ্ন তখনই ভেঙ্গে চৌচির হয় যখন তা পাঠক কিংবা প্রকাশক কর্তৃক নিগৃহীত হয়। হাজার হোক ১২০০ থেকে ১২০০০ শব্দ যাই তার পরিমান, হোক তা লিখতে অনেকটা সময় লেগেছে , মস্তিষ্কের প্রতিটি সেলে একেকটি শব্দের জন্য যতবার উত্তেজিত হয়েছে তার মূল্য কেউ কি দিতে পারবে। হ্যা এটা ঠিক যে অনেক সময় অনেক লেখকের ক্ষেত্রে প্রথম দিকের লেখা গুলো খুব ভাল হয় তারপর মাঝের কিছু দিন লেখার মান একটু মাঝামাঝি থাকে তাই বলে এটা ভাবা ঠিক নয় যে তার আবার আগের মত লেখার ক্ষমতা নেই!

যা বলছিলাম! তার সেই লেখা যখন সকলের কাছে নিগৃহীত হয় তখন লেখকের মনে একটা বড় ধরণের ব্যথার সঞ্চার করে! বলতে পারেন মন যা দেখা যায়না তার আবার ব্যথাকিসের! আরে ভাই ভালবাসাটাও তো দেখা বা দেখানো যায়না। আমরা প্রত্যেকে আমাদের সন্তানদের ভালবাসি একথা ঠিক কিনা? যদি তাই হয় তবে একজন লেখক যে তার লেখাকে সন্তান সমতুল্য ভাবছে তার নিগ্রহে এমন বেদনা হতেই পারে। আর সে যদি ছাইপাঁশ লিখত তাহলে সে তো সঠিক জায়গায় দাঁড়াতেই পারতোনা? ধরেন আপনি একজন চাকুরীজীবী যৌবনে আপনি কোম্পানীর জন্য অনেক শ্রম দিয়েছেন অনেক ত্যাগ করেছেন, সময় কে সময় ভাবেন নি, আপনার সরবচ্চ টুকু দিয়েছেন , সেই কোম্পানী যদি আপনার বয়স বাড়ার সাথে আপনার দক্ষতা যখন নিম্নগামী তখন আপনাকে কাজ থেকে বাদ দেয় তা কি আপনার ভাল লাগবে? এটা কি মেনে নেয়া যায়? কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ঠিক লেখকের ক্ষেত্রেও তাই যাদের সাথে সে সবসময় ছিল তারাই যদি একদিন তাকে অবজ্ঞা করে কেমন হবে তার অনুভূতি! বেচারা লেখকের শৈল্পিক মন একটু নরম প্রকৃতি হাজার চেষ্টা করেও অনেক যোগাযোগ করেও যখন তার একটা কাজের স্বীকৃতি না পায়, তখন তার মানসিক অবস্থা আরেকজন লেখক ছাড়া কেউ বুঝবেনা। কত নির্ঘুম রাত, ক্ষুধার্ত পেট, কত জল্পনা কল্পনা হিসেব নিকেশ করে যে একটা লেখা সাজাতে হয়, আর তা পড়তে লাগে ৫ মিনিট। পাঠকই তখন লেখকের বিচারক হয়, বিচারের উত্তর হয় হ্যা নয় না ! আহা প্রতিটি পাঠক যদি লেখক বাবু লেখাটি লিখতে আর তার যবনিকা টানতে কি কষ্টটা করেছেন তা অনুধাবন করতেন হয়ত এক ঝটকাকেই একটা মন্তব্য করতেন না!

একটি লেখা লেখার সময় কতকিছু খেয়াল রাখতে হয়! প্রথমেই নিজেকে মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে; হয়ত বাচ্চাটা অসুস্থ, হয়ত বাসায় বাজারের টাকা নেই তাই গিন্নি বারবার ঘ্যানর ঘ্যানর করছে, হয়ত বিদ্যুৎ নেই, হয়ত অসহ্য গরম, হয়ত তার নিজের শরীরটা ভাল যাচ্ছে না, তবুও তাকে যে লিখতেই হবে! আর নিয়মিত লেখা না দিলে একদিন হয়ত প্রকাশকের কাছে তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে। তাই উঠতে বসতে চলতে সবসময় নতুন লেখার চিন্তা আর সুস্থ না থেকেও নিজেকে মানসিক ভাবে সুস্থ রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা! লিখতে যে হবেই। এর মাঝে আবার লক্ষ্য রাখতে হয় কি নিয়ে লিখছেন, কার জন্য লিখছেন, কিভাবে লিখলে গ্রহণযোগ্যতা পাবে, কোন শব্দটা আগে কোনটা পরে, কিসের পর কি লিখলে ভাল, যদি লেখাটি তথ্যবহুল হয় তবে কি ধরণের তথ্য সরবরাহ করলে মানসম্মত হবে, এই তথ্যের সাথে কি বা কারা জড়িত, এর ফলে কারও অবস্থানগত কিংবা ব্যক্তিগত কোন ক্ষতির সম্ভাবনা আছে কিনা। যেকোনো লেখার সময় নিরপেক্ষতা রক্ষা করা যেন লেখাটি সরাসরি আক্রমণাত্মক না হয়। আক্রমণাত্মক হলে তাহলে আর লেখকের কি মূল্য! সে কাজ তো রাস্তায় কিংবা ফোনেই করা যায়, যেমন রাস্তাতে বিরোধী স্লোগান আর ফোনে গরম কথোপকথন! এ ছাড়াও একটি লেখা লিখতে পড়াশুনারও প্রয়োজন রয়েছে, বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের জন্য কিংবা একই বিষয়ে অন্যান্য লেখকদের মতামত আরও কত কিছু। কিন্তু কোনভাবেই অন্যের লেখা কর্তৃক প্রভাবিত হওয়া যায়না তাহলে যে নিজের স্বকীয়তা বিলীন হয়ে যাবে। দেশবরেণ্য লেখক যারা তাদেরকে অনুস্মরণ করা ভাল কিন্তু অনুকরণ নয় কারণ এতে করে লেখক তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারায়। ধরুন এখন বাংলাদেশের অন্য কোন লেখক যদি হিমু চরিত্রের নকল করে অন্য নামে আরেকটি চরিত্র যদি হিমুর আদলেই দাড় করায়, সে হয়ত সাময়িক কিছু বাহবা পেলো , এতে কি তার নিজস্ব স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার কোন সম্ভাবনা আছে? আমি মনে করি নেই। নিজের একটা পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য একজন লেখকে আজীবনের সাধনা করে যায়। অনেককে বলতে শুনেছি যারা বিভিন্ন গল্প উপন্যাস অনুবাদ করে তারা কি আবার লেখক? তারা তো অনুবাদক! হ্যা কাজের ধরণের উপর ভিত্তি করে তাকে আপনি অনুবাদক বলতে পারেন কিন্তু সে সৃষ্টিশীল লেখকও বটে! সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ভাষায় লেখা একটি গল্প কিংবা উপন্যাস অনুবাদ করে তা পাঠকের পড়ার উপযোগী করে তোলা কি এত সহজ কথা? তিনি যখন লেখাটি অনুবাদ করেন সেই লেখাটিকে সমৃদ্ধ করতে তিনি নিজে কতবার ভাবেন, কত ভাবে বিচার বিশ্লেষণ করেন, অনেক সময় লেখাটাকে গ্রহণযোগ্য করতে ভাবগাম্ভীর্য ঠিক রেখে কত সংযোজন বিয়োজন করেন তা কজন ভাবে।

একজন লেখক তার লেখার বিষয়ে অবশ্যই সততা অবলম্বন করেন আর সচেতন থাকেন। প্রথম থেকে শেষ অবধি যেন পাঠকের মস্তিষ্ক তার লেখাতেই থাকে সে বিষয়টি মাথায় রাখেন। আবার শেষ সময়ে একটা রেশ একটা আবেশ রাখার চেষ্টা করেন যা লেখনীর প্রতিটি প্যারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। কিন্তু এই সৃজনশীলতা, এই পরিশ্রম সবই বৃথা যায় যদি লেখাটি গ্রহণযোগ্য না হয়। প্রকাশকদের গুদাম ঘরে এরকম কত লেখার পাণ্ডুলিপি যে অবহেলিতভাবে পরে থাকে আর যেই লেখকরা সেই লেখাগুলি লিখেছেন তাদের মনে থাকে সন্তান হারানোর সমতুল্য বেদনা। অনেক সময় বেচারা লেখক জানেনই না যে তার লেখাটা আর প্রকাশিত হবেনা।  বাস্তবতা ধরলে প্রকাশকদেরও কিছু বাধ্যবাধতা কিংবা সীমাবদ্ধতা রয়েছে,তাদের কে অবশ্যই নিজ প্রতিষ্ঠানের সুনামের কথা চিন্তা করে লেখাটি ভালভাবে পড়তে হয় তারপর সব চিন্তা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আর সব লেখাই যে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে এর কোন মানে নেই, কিন্তু ভাই তাই বলে লেখাটিকে অজান্তেই মেরে ফেলবেন! তা না করে লেখককে বলে দিন ভাই আপনার এই লেখায় এই সমস্যা আছে, বা আপনার এই জায়গাতে একটু উন্নতির প্রয়োজন আছে তাও তো তার মনে একটা সান্ত্বনা থাকবে যে, যাক লেখাটি হয়ত প্রকাশিত হবেনা কিন্তু পরবর্তীতে কিভাবে লিখবেন তা তো জানা হল। যার সন্তান তাকেই বুঝিয়ে দিন।

আমার এই লেখাটির কথা ধরলে সেটি আদৌ প্রকাশিত হবে কিনা তা তো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই জানেন! তাদেরকে কত বিচার বিশ্লেষণ করে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হয় এটাও কি কম কষ্টকর! কিন্তু এক্ষেত্রে অনুরোধ আমরা লিখছি আপনাদের জন্য, আপনাদের কে সম্মান করি, পছন্দ করি তাই সতত চেষ্টা করে যাচ্ছি ভাল কিছু দেবো বলে, আমরা একই সুত্রে গাঁথা। আপনাদের অস্তিত্ব, আপনাদের সম্মান আমাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তাই সিদ্ধান্ত যাই হোক জানাবেন। আপনাদের কাঙ্ক্ষিত মান অনুযায়ী আমাদের সঠিক ভাবে গুছিয়ে লেখার জন্য পরামর্শ দেবেন, উৎসাহ দেবেন, এই প্রত্যাশা।

লেখক:সহ-সম্পাদক, আরএমজি টাইমস