ঢাকা মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৮



তবুও তো বেঁচে আছি

খন্দকার যোবায়ের: ভাষার জন্য, স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে হয়েছিলো বাঙ্গালীকে, গনতন্ত্রের জন্যও জীবন দিতে হয়েছিলো। কেনো? বার বার কেনো নুর হোসেনদেরকে জীবন দিতে হবে ? আসাদের রক্তে ভেজা শার্ট নিয়ে কেনো রাজপথে মিছিল হতে হবে? বার বার সালাম, বরকত, রফিকের রক্তে কেনো রঞ্জিত হবে বিটুমিনের এ পথ? তনুদের সম্ভ্রম আর রেশমাদের ঘামের কি কোন মূল্যই নাই? বাঙ্গালী এত সূর্য সন্তান কোথায় পাবে? এ জাতি এত নুর হোসেন কোথায় পাবে? এত সম্ভ্রম এ জাতির কই, যে বিলিয়ে দিবে? মাসে মাসে, বছরে বছরে অধিকার আদায়ের আন্দোলন আর কতকাল চলবে? অধিকার আদায়ের জন্য কেনো বার বার রাস্তায় নামতে হবে? বৈষম্যের কারেন্টজাল ছিড়ে কবে বিবেকের দড়জায় চপেটাঘাত পরবে? কবে ভেতর থেকে জাগ্রত হবে শিশির বিন্দুর মত বিশুদ্ধ একফোটা মানবতা?

এক অবিরাম বৃষ্টির রাতে অন্তঃপুরের পুষ্করিণীর জলে ঝাপ দিয়ে কাদম্বিনীকে প্রমাণ করতে হয়েছিলো কাদম্বিনী মরেন নাই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ছোট গল্প “জীবিত ও মৃত” এর কাদম্বিনী দেবীর মত এখন মরিয়া প্রমাণ করিবার সময় এসেছে, আমরা মরি নাই। আমরা পদ্মা নদির মাঝির ঝড়ের রাতে কুবেরের নৌকায় মিট মিট করে জ্বলতে থাকা কেরোসিনের কুপির মতো এখনও জ্বলছি। জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হচ্ছি। অথচ আমাদের জীবনের পোড়া সেই গন্ধ বিদেশী পারফিউমের সুগন্ধিকে ফাঁকি দিয়ে পদ্মা নদির মাঝির ভদ্র পল্লির ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারেনা। পোড়া গন্ধটা ফুটপাতের ঝুপড়ি চায়ের দোকান থেকে বড়জোর গলির শেষ মাথার মোড় পর্যন্ত পৌছায়। আমরা চিৎকার করতে পারি না। আমরা অধিকারের কথা বলতে পারিনা। জীবিকার দারুণ অনিশ্চয়তার জন্য নিজের অতি প্রয়োজনীয় চাহিদা অপুরণ থাকা সত্তেও অস্ফুট আর্তনাদ করেও বলতে পারিনা। নিতান্তই দরকারী ও অতি দরকারী চাহিদার পাহাড়ের চাপে চ্যাপ্টা হতে হতে ফুটপাতের দেয়ালে স্টিকার হয়ে যাই আমরা। আর সেই স্টিকারের পাশেই পুজিবাদের বিশ্বে ভিশন অবহেলা ও তিরস্কারের অট্রহাসি হেসে গড়ে ওঠে বৈষম্যের কঠিন প্রাচীর। প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদ স্যার যতার্থই বলেছিলেন “মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষগুলোই ধনীর আসল রুপ দেখতে পায়”। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েরা বেঁচে থাকার জন্য যতটা যুদ্ধ করে, ধনীর ছেলে-মেয়ে শ্রমিকের ঘামে ভেজা শ্রমের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ উড়িয়ে দিতেও ততটা কষ্ট করেনা। শ্রমিক ক্ষুধা লাগলে বলতে পারে, অথচ মধ্যবিত্তের পেটের চামড়া পিঠে লেগে গেলেও আর্তনাদ করতে পারেনা। সারাক্ষন রং মেখে সমাজের সর্বশ্রেনীর সাথে সুখি ও সাচ্ছন্দের অভিনয় করতে হয় সব সময়। মধ্যবিত্তরাই অভিনয়ে সেরা। শত অপূর্ণতাকে বুকের প্রকষ্ঠে চাপা দিয়ে “ভালো আছি” মিথ্যাকে সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রতিনিয়ত মিথ্যা হাসি হাসতে হয়।

নিতান্তই উদহরণের জন্যই বলছি। একজন অষ্টম শ্রেণী পাশ চতুর্থ শ্রেণীর সরকারী কর্মচারীর বেতন আজ কত? অষ্টম শ্রেণীর একজন সরকারী কর্মচারী (হয়ত) সামান্য বা অসামান্য উৎকচের বিনিময়ে অথবা বিভিন্ন কোটার জোরে চাকুরীটা জুটিয়ে নেয়। সমাজে তার স্ট্যাটাস বৃদ্ধি পায়। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী থেকে উচ্চ পর্যায়ের প্রায় প্রতিটি ধাপে বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। মাষ্টার্স পাশ করা একজন সদ্য বেকার যখন তথাকথিত উৎকচের টাকা জোগাতে ব্যর্থ হয়ে চোখে অমবস্যার অন্ধকার দেখে, তখন তার চেয়ে নিতান্ত অযোগ্যতারই একজনবন্ধু অন্তত দারুন স্বচ্ছলতায় ছুটে যায় সামনের দিকে। দিশেহারা বেকার যুবক তখন খুঁজতে থাকে তার ভুলগুলো। একসময় আবেগ আর বাস্তব অনুভুতিই তাকে বলে দেয় শিক্ষা আর মেধা অর্জনই তার ভুল। মধ্যবিত্তের ঘরে জন্ম নেওয়াই তার ভুল। বেকার সে যুবক তখন নিজের অজান্তেই নিজেকে প্রশ্ন করে, শিক্ষিতের লেবাস গায়ে লেপটে দিয়ে আর কতদিন এই প্রহসনমূলক পার্থক্য তৈরি করে রাখা হবে? একই ক্লাসের সবচেয়ে খারাপ ছাত্রটা একদিন বাবার টাকার সিড়িতে পা রেখে তরতর করে উপরে উঠে যায়। আর ক্লাসের ফাষ্টবয় অবহেলা আর হতাশার ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে খুজে নেয় জীবিকার সর্বশেষ আশ্রয়।

বিশ্বায়নের বিশ্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশক শিল্প আজ পোশাক রপ্তানির শির্ষে। এই শিল্পে অসংখ্য এমন শিক্ষিত বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছে। মাত্র কিছুদিন আগেও যেখানে গার্মেন্টস বলতে যারা নাক সিটকাতো, আজ তারাই নিজেদের ছেলে মেয়েদের জন্য গার্মেন্টস এর চাকুরীর জন্য ধর্না দিচ্ছে দ্বারে দ্বারে। শুরু হয়ে যাচ্ছে তার কর্ম জীবন। ছকবাধাহীন মুক্ত জীবনের বাইরে এসে তখন মনে হয়, এ যেনো বন্দিশালা, এ যেনো এক স্বাধীন কারাগার। নিজেকেই, নিজে আবার সান্তনা দেয়, তবুওতো বেঁচে থাকার অবলম্বন একটা হয়েছে। মাস শেষে চাহিদার তুলনায় বেতনের অপর্যাপ্ত টাকা পেয়েও প্রথমে খুশিতে চোখ দুটো ভিজে যায়। খুশিতে বাবা অথবা মা কে ফোনে বলে আমাদের আর কোন দুঃখ থাকবে না। বাসা ভাড়া আর সারা মাসের খাবারের টাকা রেখে যখন গ্রামে অসুস্থ্য বাবাকে টাকা পাঠাতে যাবে তখন আরও একবার তার চোখ দুটো ভিজে যায়। এবার আর খুশিতে তার চোখ ভেজেনা। এবার দারুন রকমের হতাশায় সে অস্থির হয়ে পরে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে উৎকোচের বিনিময়ে চাকুরী পাওয়া ক্লাসের শেষ বেঞ্চের তারই বন্ধুর হাস্যোজ্জল ছবি। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে আবারও সান্তনা দেয়, ”তবুও তো বেঁচে আছি”। তৈরি পোশাক শিল্পের একজন কর্মী হিসাবে সে নিজেকে গর্বিত মনে করে।

বছর ঘুরতেই সে বুঝতে পারে এখানেও নিদারুণ ও যন্ত্রনার বৈষম্যের সাগরে সে ডুবে যাচ্ছে প্রতি নিয়ত। তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিটি সেকশন ও ডিভিশন কে একই ভাবে মূল্যায়ণ করা হয় না দেখে আবারও বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। বৈষম্যের হতাশায় বুকের ভেতরটা আবারও ভারী হয়ে যায়। চোখের সামনে কম্পিউটারের মনিটরটা ঘোলা হয়ে ওঠে নিমিষেই। কাজের বিচারকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলার দৌড়ে সবাই এগিয়ে থাকতে পারেনা। রাতদিন একাকার করে পরিশ্রম করা একজন অফিসার তোষামদে তুষ্ট কর্মকর্তার কাছে হেরে যায় বারবার। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে লোনা জলে ভিজে ওঠা চোখ দুটো মুছে নিজেই নিজেকে প্রনোদিত করে। জীবিকার প্রয়োজনে আগাতে থাকে তার খুড়িয়ে চলা। হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে চলা সেই অফিসার/কর্মকর্তার মেধায় মরিচা পড়ে যায়। শানিত মস্তিস্ক আর কাজ করেনা আগের মত। দেশের নীতি নির্ধারক থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের নীতি নির্ধারক সবার কাছেই তরুন, মেধাবী আর শিক্ষিত জনের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ফিকে হতে হতে নিভে যায় একদিন। চারপাশে নেমে আসে ঘুটঘুটে আর ভয়ানক কালো অন্ধকার।

প্রতি বছরের কর্ম মূল্যায়নের সময় অকর্মার তকমা লাগে। অথচ ছুটি চাইলে যখন শুনতে হয়, তোমার কাজ করবে কে শুনি? তখন যেনো গোলক ধাঁধার গহ্বরে ডুবে যায় সে। সামান্য সচ্ছলতা আর পরিবারের ভবিষৎ এর দোলাচলে দোদূল্যমান হয়ে যায় জীবনের একটি অংশ। বার বার হেরে গিয়েও পরাজিত না হওয়া এমন হাজারও উদ্যোমী শিক্ষিতজনেরা প্রতিনিয়ত নিজেই নিজেকে প্রনোদিত করছে। ইনকামের জন্য সরকারকে ট্যাক্স দেওয়ার পরেও আবার নানান পণ্যের জন্য ভ্যাট দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে উৎকচে বা কোটায় পাওয়া একজনের চাকুরীর বেতন, বোনাস, নানান ধরণের ভাতা, গৃহ লোন সহ বিবিধ রকমের সুবিধা পাচ্ছে পিছনের ব্যাঞ্চের সেই ছেলেটা।

বৈষম্যহীনতা ও মেধার যথাযথ মূল্যায়ণ হয়ত বাংলাদেশকে একদিন সত্যিকারের সোনার বাংলায় রুপান্তর করতে পারে। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য এটাই হোক আমাদের কাম্য।

Write a comment

Print Friendly, PDF & Email

এই বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ



error: Content is protected !!