প্লাস্টিক দূষণ বন্ধের প্রত্যয়ে গোল টেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত

ফজলুল হক, নিজস্ব প্রতিবেদক: পরিবেশ ও জীব বৈচিত্রের জন্য ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্লাস্টিকের বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে। একটি প্লাস্টিক মাটিতে মিশতে প্রায় পাঁচশ বছর সময় নেয়। গবেষণা বলছে, বছরে ৮০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে যাচ্ছে যা পানি, মাটি ও পরিবেশের ভয়াবহ ক্ষতি করছে। প্লাস্টিক দূষণে প্রতি বছর ১০ লাখ প্রাণী মারা যাচ্ছে। প্রতিবছর ৪ বিলিয়ন প্লাস্টিক বোতল তৈরী হচ্ছে। কিন্তু পূণঃব্যবহার বা পূণঃচক্রায়ন করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ১-২%। এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রে মাছের তুলনায় সমুদ্রে প্লাস্টিক পণ্যই বেশি থাকবে। এসব তথ্যউপাত্তগুলো আমাদের জন্য হুমকি স্বরুপ। প্লাস্টিক পণ্য পূণঃব্যবহার বা পূণঃচক্রায়ন নিশ্চিত না করা গেলে পৃথিবী নামক বাসযোগ্য এই গ্রহটিতে মানুষের জীবনযাপন  অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। 

গোল টেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন এসএমএস এনভায়রনমেন্টাল এলায়েন্স এর কর্ণধার ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মি. আব্দুল আলিম, UNIDO এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি মি. জাকি-উজ-জামান, এসআর এশিয়ার বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুমাইয়া রশিদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহা পরিচালক ড. সুলতান আহমেদ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর জাকারিয়া চৌধুরী ও ইউনাইটেড গ্রুপের এসোসিয়েট ডিরেক্টর ফাহাদ খান (বা থেকে ডানে)

শনিবার রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরুমে আয়োজিত ‘প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করি’ শীর্ষক একটি গোল টেবিল আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজনে করে আন্তর্জাতিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান  ‘সোস্যাল রেসপন্সিবিলিটি এশিয়া (এসআর এশিয়া)’ ও পরিবেশ বিষয়ক কনসালটেন্সি ও পরিদর্শন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘এসএমএস এনভায়রনমেন্টাল এলায়েন্স’।

এতে তৈরী পোশাক কারখানা, আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান, ব্র্যান্ড, সরকারী কর্মকর্তা, এনজিও, মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে দুই শতাধিক প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন।

এসএর এশিয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সুমাইয়া রশিদের পরিচালনায় গোল টেবিল আলোচনার শুরুতে ‘প্লাস্টিক-নীরব ঘাতক’ শীর্ষক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন এসএমএস এনভায়রনমেন্টাল এলায়েন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল আলিম।

গোল টেবিল আলোচনায় পরিবেশ অধিদপ্তরের মহা পরিচালক ড. সুলতান আহমেদ এর সভাপতিত্বে প্যানেল ডিসকাশনে অংশগ্রহণ করেন ইউনাইটেড ন্যাশনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেপলভমেন্ট অর্গানাইজেশ এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি জাকি-উজ-জামান ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর জাকারিয়া চৌধুরী ও ইউনাইটেড গ্রুপের এসোসিয়েট ডিরেক্টর ফাহাদ খান।

আলোচনায় আব্দুল আলিম বলেন, উন্নত দেশগুলোতে প্লাস্টিক ব্যবহার ও দূষণের মাত্রা অনেক বেশি। শুধুমাত্র আমেরিকাতে প্রতি বছর ১০.৫ মেট্রিক টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরী হচ্ছে কিন্তু রিসাইকেল হচ্ছে সর্বোচ্চ ১-২ %।

তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্লাস্টিকের বাজার প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার, যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ হাজার প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে প্রায় ২০ লাখের বেশি লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। প্লাস্টিক ব্যবহার নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাড়িয়েছে। এমন অবস্থায় প্লাস্টিক ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা অসম্ভব, তবে এখুনি সময় প্লাস্টিকের বিকল্প চিন্তা করার। প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করতে চাইলে সরকারের কঠোর পদক্ষেপসহ সকলের সচেতনতা প্রয়োজন। প্লাস্টিক পণ্যের পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের স্বাভাবিক জীবনযাপন ঝুঁকির মুখে পড়বে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহা পরিচালক ড. সুলতান আহমেদ বলেন, সারা বিশ্বে প্লাস্টিক দূষণ রোধে সচেতনতা বাড়ছে। বাংলাদেশে প্লাস্টিক দূষণ রোধে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি সরকার রাজধানীতে পলিথিনের শপিং ব্যাগ উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে এসব পলিথিনের বাজারজাত মনিটরিং করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

অনুষ্ঠানের কিছু খন্ডচিত্র

তিনি বলেন, এখানে প্রতি বছর মাথাপিছু প্রায় পাঁচ কেজি প্লাস্টিক দ্রব্যাদি ব্যবহৃত হয়। শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই প্রতিদিন এক কোটি চল্লিশ লাখ পলিব্যাগ পরিত্যক্ত হচ্ছে। সরকারী প্লাস্টিক পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটআশ থেকে তৈরী সোনালি ব্যাগ বাজারে আনছে।  পলিথিনের তুলনায় পাটের পলিমার দিয়ে তেরী সোনালী ব্যাগ দেড় গুণ বেশি ভার বহন করতে পারে। এটি পানি শোষণ না করলেও ফেলে দেওয়ার তিন থেকে চার মাসের মধ্যে পচে মাটির সাথে মিশে যায়।

ইউনাইটেড ন্যাশনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেপলভমেন্ট অর্গানাইজেশ এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি জাকি-উজ-জামান তার তথ্যবহুল আলোচনায় বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উদ্বেগের বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে। ১৩ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক প্রতিবছর সাগরে পতিত হওয়ার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে সাগরে মাছের তুলনায় প্লাস্টিকের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। পৃথিবীব্যাপী প্রতি মিনিটে ১০ লাখ প্লাস্টিক বোতল সাগরে পতিত হয়, যা জলজ প্রাণীর জন্য হুমকি। ব্যবহৃত প্লাস্টিকের অধিকাংশ মাটির সঙ্গে মিশে যায় না এবং কিছু কিছু মিশলেও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

তিনি বলেন, প্লাস্টিক দূষণ রোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার এতোটাই জড়িয়ে আছে যে এখন ইচ্ছে করলেও তা একেবারে বয়কট সম্ভব হবে না। তবে প্লাস্টিকের পূণঃব্যবহার ও সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর জাকারিয়া চৌধুরী বলেন, বিশ্বব্যাপি প্লাস্টিক দূষণের মাত্রা ভয়াবহ রুপ ধারণ করা হয়েছে। প্লাস্টিক দূষণ রোধে এর বিকল্প সৃষ্টি করতে হবে। সকলকে দায়িত্বশীল হতে হবে।

ইউনাইটেড গ্রুপের এসোসিয়েট ডিরেক্টর ফাহাদ খান বলেন, প্লাস্টিকের অত্যধিক ব্যবহারের ফলে উর্বর কৃষি জমি থেকে শুরু করে খাল-বিল, নদ-নদী এবং সাগর-মহাসাগরের প্রতিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তাই প্লাস্টিকের পুনঃব্যবহার এবং পুনঃচক্রায়ন অতিব  প্রয়োজন।’ইউনাইটেড গ্রুপ সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রতিশ্রুতবদ্ধ।

গোল টেবিল আলোচনা অনুষ্ঠান আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করে ইউনাইটেড গ্রুপ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও তৈরী পোশাকখাত নির্ভর অনলাইন মিডিয়া ‘আরএমজি টাইমস’ ।

 

Write a comment

Print Friendly, PDF & Email

এই বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ



error: Content is protected !!