ঢাকা শুক্রবার, নভেম্বর ১৬, ২০১৮



বিদেশী কর্মী নিয়োগ: একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ

মোঃ ওয়ালিদুর রহমান বিদ্যুৎ : বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্প সেক্টরে বিশেষত গার্মেন্টস সেক্টরে প্রচুর বিদেশী যেমন ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান ফিলিপিনো, তুর্কী, পাকিস্তানি নাগরিকরা কাজ করেন। তাদের প্রায় ৯৯%ই টেকনিক্যাল কোরের। কেউ কেউ আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিইও লেভেলেও কাজ করেন।

মূলত কনসালট্যান্ট বা টেকনিক্যাল এ্যাসিসট্যান্স দেবার প্রোভিশন দেখিয়ে নিয়োগ করা হয়। অন্যান্য শর্তাবলি প্রায় এক হলেও তাদের বেতন ভাতা অস্বাভাবিকভাবে দেশীয় ওই একই রকম পদবী বা অভিজ্ঞতার কর্মীদের থেকে কয়েকগুন বেশি। বিদেশে হতে কর্মী হায়ার করে আনলে তাদের বেশি বেতন দিতে হবে-সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা অস্বাভাবিক রকমের ব্যবধান হওয়াটা একটু আপত্তিকর। পাশাপাশি তাদেরকে প্রতিষ্ঠানগুলোর সিইও লেভেলে বসিয়ে দেয়ায় বাংলাদেশি কর্মীরা বিষয়টাকে সহজভাবে দেখছেন না।

অনুচ্চারিত হলেও খুব গোপনে বা নিভৃতে শিল্প সেক্টরে বিদেশী টেকনিক্যালদের নিয়ে স্থানীয় কর্মীদের ব্যাপক ক্ষোভ আছে। আমি আমার কর্মজীবনে অনেক সিনিয়র প্রোফেশনালকে দেখেছি, তার প্রতিষ্ঠানে বিদেশী বস নিয়োগ হওয়ায় বা তার সাথে পেশাগত দ্বন্দ্বে জব ছেড়ে নতুন কোথাও জব খুঁজতে। বিভিন্ন কারনেই বিদেশী কর্মীদের স্থানীয় কর্মীরা সহজভাবে নিচ্ছেন না। পুরো বাংলাদেশের অনলাইন মিডিয়াতে আপনি প্রচুর পোস্ট দেখবেন বিদেশী কর্মীদের বিপক্ষে। তারা কত টাকা বাংলাদেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন তার ভুড়ি ভুড়ি হিসেব পাবেন ফেসবুকে।

কেন প্রতিষ্ঠান মালিকরা বিদেশী শ্রমিক/কর্মী নিয়োগ করছেন, তার বিভিন্ন কারন ও বাস্তবতা আছে। আছে কিছু হঠকারী কারনও। চলুন, একবার দেখে আসি, কী সেই কারন:

১. সিংহভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠান মালিকরা টেকনিক্যাল স্কিলের প্রয়োজনে বিদেশী কর্মী আনেন। গার্মেন্টস সেক্টরে ওয়াশ, স্যাম্পলিং, ওয়ার্কস্ট্যাডি, ডিজাইন, টেক্সটাইল খাতে সিনিয়র ও টেকনিক্যাল কাজে বাংলাদেশী কর্মীরা তাদের কাঙ্খিত পর্যায়ের দক্ষতা দেখাতে পারেন না বলে তারা যুক্তি দেখিয়ে থাকেন। তবে ঠিক কোন কোন টেকনিক্যাল কাজে বাংলাদেশে এক্সপার্টিজের অভাব সেটি একটু গোলমেলে। যেসব দেশ হতে গার্মেন্টস সেক্টরের ওয়াশ, স্যাম্পলিং, ওয়ার্কস্ট্যাডি, ডিজাইন সেকশনের বিদেশী কর্মী হায়ার করা হয়, সেই দেশগুলো গার্মেন্টস শিল্পে বাংলাদেশের পিছনে। তাহলে আমাদের এখানে এক্সপার্টের অভাব পেছনে থাকা দেশগুলো হতে আসতে হয় কেন-সেটি একটু প্রশ্নসাপেক্ষ। অনেক সময়ই বলা হয়, দেশে মেধাবিদের না খুঁজেই সহজে একজন বিদেশী ডেকে নেয়া হয়। তাছাড়া দেশী টেকনিক্যালদেরকে বেতন নির্ধারনের সময় বিদেশীদের সমান মর্যাদা দেয়া হয় না। দেখা যায়, একই পজিশনে একজন বিদেশীকে যেই বেতনে হায়ার করা হয়, তার তিন ভাগের একভাগ বেতনে দেশী লোক খোঁজা হয়। স্বাভাবিকভাবেই সেক্ষেত্রে মেধাবী ও এক্সপার্টরা এগিয়ে আসবেন না।

২. কিছু কিছু ক্ষেত্রে বায়াররা অর্ডার প্লেস করার ক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠানে বিদেশী এক্সপার্ট থাকলে ভরসা বা আস্থা যেটাই বলেন, সেটা সৃষ্টি হয় ও প্রতিষ্ঠানের অর্ডার পেতে সুবিধা হয়-বলে উদ্যোক্তারা বলে থাকেন। মার্কেটিং ও ব্রান্ডিং করবার স্বার্থে এটা করা হয়। 

৩. বিদেশী কর্মীরা টপ পজিশনে কাজ করলেও তারা কখনোই মালিকের বিশ্বাসভঙ্গ করে প্রতিষ্ঠানটিকে দখল করেন না বলে বলা হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই দেশী লোককে টপ বিজনেস পজিশনে বসালে তারা একটা পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের করে নেবার চেষ্টা করেন। 

৪. কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিদেশী কর্মীদেরকে রাখা হয় জুনিয়র মেটদের আনুগত্য ধরে রাখতে। কিছু কিছু শিল্পোদ্যোক্তা অভিযোগ করে থাকেন, উঁচু পজিশনে বিদেশী থাকলে তাকে কর্মীরা যতটা মেনে চলে, অনেক ক্ষেত্রেই দেশী বসদের কর্মীরা ততটা ঠিকমতো ফলো করে না। তাছাড়া বলা হয়ে থাকে, আমাদের স্থানীয় এক্সপার্টরা প্রোফেশনাল বিহ্যাভিয়র ও এটিচুডে পিছিয়ে আছেন।

৫. বিদেশী কর্মীদের আনুগত্য ও কাজের আন্তরিকতা, ঐকান্তিকতা দেশী অনেক সিনিয়র কর্মীদের চেয়ে বেশি-এই কারন দেখিয়েও অনেক শিল্প মালিক বিদেশী হায়ার করে থাকেন। বলা হয়ে থাকে, বিদেশীরা কাজে মনোযোগ, আন্তরিকতা, পরিশ্রম, ঐকান্তিকতা, সিরিয়াসনেস এ এগিয়ে থাকে।

৬. স্থানীয় টপ লেভেলের এক্সিকিউটিভদের নিম্নস্তরের কমিউনিকেশান স্কীলের কারনে মালিকরা বিদেশী কর্মী হায়ার করে থাকেন। আমাদের এক্সপার্টরা টেকনিক্যাল বা প্রোফেশনাল কাজে দক্ষতা থাকলেও তাদের প্রেজেন্টেশন স্কীল, কমিউনিকেশন, টীম বিল্ডিং, লিয়াজোঁ রক্ষা ইত্যাদির দক্ষতা কম। প্রতিষ্ঠানকে তারা বায়ারের সামনে প্রেজেন্ট করতে পারেন না।

৭. অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্থানীয় কর্মীরা টেকনিক্যালী দক্ষ হলেও তারা ম্যানেজমেন্ট স্কীলে ও টীম লিডিং এ একদমই আনাড়ি। কীভাবে একটি টীমকে বিজনেস ফ্রেন্ডলী ও সুপার কস্ট ইফেকটিভভাবে সুসংগঠিত আকারে গড়ে তুলতে, চালিয়ে নিতে হয়, সেই ম্যানেজমেন্ট স্কীল বাংলাদেশী কর্মীদের কম থাকে। তারা বেশিরভাগই নিজের কাজটুকু ভালভাবে করতে পারে। ফলে ম্যানেজারিয়াল র‌্যাংকে বিদেশীদের সুযোগ বেড়ে যায়।

৮. সবচেয়ে সহজ যুক্তিটি হল, মালিকদের চাই প্রদত্ত বেতনের বিপরীতে ভাল কাজ। তারা ভাল দক্ষ কর্মী পেলে টাকা খরচ করতে দ্বিধা করেন না। তাই প্রদত্ত বেতনের বিপরীতে তারা ভাল কর্মী পাওয়াকে সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি দেন। সেখানে দেশী বা বিদেশী খুব গুরুত্বপূর্ন নয়। 

৯. যেহেতু বাংলাদেশের প্রচুর মানুষ বিদেশে যান ও কাজ করে রেমিট্যান্স নিয়ে আসেন যেটা আমাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফরেন কারেন্সি আর্নার, যেটা নিয়ে আমরা গর্বও করে থাকি, সেখানে আমাদের এখানেও বিদেশী কর্মী কাজ করবে-সেটাইতো স্বাভাবিক। গ্লোবালাইজেশনের যুগে শ্রমের কোনো সীমান্ত থাকে না। সে সেখানেই যাবে যেখানে সে কাজ ও টাকা পাবে। যেখানে সে কদর পাবে।

যে কারনগুলো বলা হল, সেগুলো মূলত নিয়োগদাতাদের যুক্তি। যদিও অনেকেই মনে করে থাকেন, ওই যুক্তিগুলো খুবই ঠুনকো এবং অসার। একটু চাইলেই মালিকরা ওই সমস্যা হতে বিদেশী ছাড়াই মুক্তি পেতে পারতেন। তা না করে তারা বিদেশী আনতে বেশি পছন্দ করেন-এমনটা অভিযোগ স্থানীয় কর্মীদের।

এবার তাহলে দেখি, বিদেশী কর্মীদের নিয়ে বাংলাদেশী কর্মীদের ক্ষোভ ও পাল্টা যুক্তিগুলো:

১. দেশে স্কীলড কর্মীর সংখ্যা কম বা যথেষ্ট নয় বলে মালিকরা যেই যুক্তি দেন, বাংলাদেশী এক্সপার্টরা তাকে মিথ্যে অযুহাত বলে উল্লেখ করে থাকেন। তাদের অভিযোগ হল, কোনোরকম যাঁচাই বাঁছাই না করেই নিয়োগকর্তারা বিদেশীদের নিয়ে নেন। দেশে থাকা মেধাবীদের সমান সুযোগ ও সুবিধা দিলে ঠিকই তারা স্কীল দেখাতে পারতেন।

২. শুধুমাত্র শো অফের উদ্দেশ্যে কেউ কেউ বিদেশী কর্মী হায়ার করেন বলে অভিযোগ করা হয়। 

৩. কর্মরত বিদেশী কর্মীরা নেটওয়ার্কিং ও জোট বেঁধে শিল্প সেক্টরে আরো নানা অযুহাতে তাদের স্বদেশীদের আমদানী করে নিয়ে আসছেন-এমন তীব্র অভিযোগ আছে।

৪. বিদেশ হতে কর্মীদের একটা বড় অংশ ভুয়া কাগজপত্র, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভুয়া সনদ নিয়ে এসে বেশি বেতনের পদগুলো বাগিয়ে নিচ্ছেন-এমন অভিযোগ আছে। এটা হবার সুযোগ খুবই বেশি। কারন তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতার সনদগুলো কার্যত কোনো যাঁচাই হয় না।

৫. কিছু কিছু বিদেশী কর্মীর বিশেষত ফিলিপিনো, তুর্কী, ভিয়েতনামীজদের ইংরেজি ভাষাগত অদক্ষতার কারনে স্থানীয় কর্মীরা তাদের সাথে কমিউনিকেট করতে পারেন না। ফলে তাদের এক্সপার্টিজ প্রতিষ্ঠানে কাজে লাগানো কঠিন হয়ে যায়। এমনকি তাদের সাথে সহজ ও দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ইংরেজিতে বাংলাদেশের একটা বড় সংখ্যক কর্মী অদক্ষ হওয়ায় তথ্য ও নির্দেশনাসহ জ্ঞান ডিসেমিনেট করা বাঁধাগ্রস্থ হয়।

৬. বিদেশী কর্মীরা স্থানীয় কর্মীদের সাথে অপমানসূচক, কর্তৃত্বপূর্ন ও হেয় আচরন করেন বলে অভিযোগ আছে।

৭. বেতনের ক্ষেত্রে একই রকম দক্ষতা থাকা স্বত্ত্বেও দেশী এক্সপার্টদের বেতন বিদেশীদের কয়েকগুন কম হয়ে থাকে। জব মার্কেটে এই বৈষম্য তীব্র অসন্তোষ ও শত্রূতা তৈরী করছে।

৮. যদিও এনবিআর কিংবা বিওআই এর কাছে কোনো সঠিক হিসাব নেই, বিদেশী কর্মীরা সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ২০-৩০ হাজার কোটি টাকা বেতন হিসেবে বাংলাদেশ হতে বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন বলে শোনা যায়। অঙ্কটা একটি পদ্মা ব্রীজের বাজেটের সমান।

৯. বিদেশীরা বস পজিশনে বসে যাওয়ায় উপরের দিকের পজিশনে তারা বাংলাদেশী এক্সপার্টদের পদায়ন হতে দেন না বলে অভিযোগ আছে। এর সত্যতাও পাওয়া গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানেই একটা নির্দিষ্ট পজিশনের পরে আর দেশী কাউকে নিয়োগ দেয়া হয় না। 

১০. বিদেশী কর্মীদের একটি বড় অংশ কর ফাঁকি দেন বলে অভিযোগ আছে। 

১১. কর্মরত বিদেশী কর্মীদের নিয়ে (বিশেষত একটি বিশেষ দেশের কর্মীদের নিয়ে) অভিযোগ আছে যে, তারা বাংলাদেশ হতে গার্মেন্টস ব্যবসাকে তাদের নিজেদের দেশে ডাইভার্ট করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছেন। এই অভিযোগ একদমই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবার মতো নয়। সাধারন বুদ্ধিই বলে, একটি প্রতিষ্ঠানের সিইও যদি হন প্রতিযোগী দেশগুলোর, আর তারা সংখ্যায় বেশ বড় হন, তবে তারা সংগঠিতভাবে বাংলাদেশের ব্যবসাকে তাদের দেশে ডাইভার্ট করার ক্ষমতা রাখেন। কারন ব্যবসাটা মূলত তাদের হাত দিয়েই চলে।

১২. বিদেশী কর্মী হায়ার করার শর্ত হিসেবে বলে দেয়া হয়, ওই বিদেশী কর্মীকে ওই ক্যাটেগরীতে স্থানীয় এক্সপার্টের অপ্রাপ্তির কারনে আমদানী করার অনুমতি দেয়া হলেও একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানকে তাকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব স্থানীয় এক্সপার্ট প্যানেল তৈরী করে নিতে হবে। কিন্তু সেটি কখনোই করা হয় না। নানা ছলছুতা করে তাদেরই রেখে দেয়া হয়। আর বিদেশীদের এক্সপার্টিজ কখনোই স্থানীয়দের মধ্যে কনভার্ট করা যায় না। তার নানা বাস্তব কারন আছে। ফলে দিনকে দিন বাংলাদেশ বিদেশী এক্সপার্ট আমদানীর ফাঁদ হতে বের হতে পারছে না।

১৩. প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিদেশী কর্মীরা বিদেশে হতে সরাসরি এসে জয়েন করেন। একটা বড় সংখ্যক ক্ষেত্রেই তাদের তেমন কোনো টেকনিক্যাল ইন্টারভিউ এমনকি জেনারেল ইন্টারভিউ পর্যন্ত হয় না। ফলে অদক্ষ বিদেশীরা স্রেফ আগের চাকরীর রেফারেন্স কিংবা ভুয়া সনদ কিংবা নামকাওয়াস্তে থাকা যোগ্যতাসহ চাকরী পেয়ে যান প্রায় বিনা আয়াসে। অথচ ওই পজিশনে একজন দেশী কর্মী আবেদন করলে তাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাঁচাইয়ের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। কোনো সন্দেহ নেই, দেশী আবেদনকারীরা বৈষম্যের শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে কোনোরকম জব সার্কুলার ছাড়াই বিদেশীদের সরাসরি নিয়ে নেয়া হয়। ফলে মনোপলি হয়ে যায়। 

১৪.বিদেশী মানেই দক্ষ ও ভাল-এই ভুল এপ্রোচের জন্য এদেশী এমপ্লয়াররা বিদেশীদের ইন্টারভিউ করতেও সংকোচ বোধ করেন। আমাদের এইচআরগুলোও একজন বিদেশী দেখলে বিগলিত হয়ে পড়েন বা পড়তে বাধ্য হন।

কীভাবে এই অবস্থা হতে পরিত্রান পাওয়া সম্ভব? 

১. প্রথমত এটা মেনে নিতে হবে যে, কিছু কিছু বিদেশী কর্মী সারাজীবনেই নেয়া বলবত থাকবে। বিদেশ হতে দক্ষ কর্মী আমদানী কোনোকালে কোনোদেশেই পুরোপুরি বন্ধ হবে না। যেটা করা সম্ভব সেটা হল, হারটা কমিয়ে আনা।

২. আমাদের সরকারকে একটি গবেষনা কিংবা জরিপ করতে হবে। দেশে কোন কোন খাতে কী ধরনের এক্সপার্ট কাজে বিদেশীরা কাজ করছে, সেই এক্সপার্টিজ তৈরীর জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান করতে হবে। আমাদের নিজস্ব এক্সপার্ট সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও টেকনিক্যাল শিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে। বই পড়া বিদ্যার বদলে প্রকৃত ও সেক্টর সংশ্লিষ্ট শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. বিদেশে আমাদের যেসব মেধাবী সন্তানরা কাজ করছেন, কিংবা প্রতিবছর চলে যাচ্ছেন, তাদের দেশে ফেরত আনা, দেশের কাজে লাগাবার ব্যবস্থা করতে হবে।

৪.বিদেশী কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান যেসব আইন ও শর্ত আছে-সেগুলো মানা হচ্ছে কিনা, তা যথাযথ তদারকী করতে হবে।

৫. বিদেশী কর্মীরা যথাযথ নিয়ম মেনে, ট্যাক্স দিয়ে কাজ করছেন-সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

৬. সমান দক্ষতা থাকলে দেশী এক্সপার্টদের অগ্রাধিকার দিতে হবে-এই মর্মে সুরক্ষা নীতি দিতে হবে।

৭. সমান দক্ষতার ক্ষেত্রে দেশী ও বিদেশীদের মধ্যে কোনো বেতন বৈষম্য করা যাবে না। এটাতো খুবই লজিক্যাল, যে, দক্ষতায় সমান হলে কেন শুধুমাত্র বিদেশী-এই যুক্তিতে কাউকে বেশি বেতন দেয়া হবে?

৮. একজন বিদেশী কর্মী হায়ার করলে, কতদিনের মধ্যে তিনি তার টীমকে সমান না হোক, প্রায় একই রকম দক্ষতায় দক্ষ করে তুলবেন বা অন্যভাবে বললে, তিনি কীভাবে কতদিনে তার প্রতিষ্ঠানে একটি দক্ষ টীম তৈরী করবেন তার পরিকল্পনা ও ওয়ার্ক প্ল্যান তাকে দিতে হবে।

৯. বিদেশী কর্মীদের সনদ ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ডকুমেন্ট যথাযথ কর্তৃপক্ষকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাঁচাই করে ছাড় দিতে হবে। প্রচুর অভিযোগ পাওয়া যায়, আমাদের দেশের মতো ওইসব দেশ হতে অদক্ষ, আনাড়ি, অশিক্ষিতরাও সনদ কিনে বা বানিয়ে নিয়ে এদেশে চাকরী পেয়ে যান। এখানে বরং তারা টেকনিক্যাল শিক্ষায় হাত পাকান। 

১০. বিদেশী কর্মীদের একটি পারফেক্ট ও আডডেটেড ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরী করতে হবে যেখানে তাদের প্রোফেশনাল সব ডাটা সংরক্ষিত থাকবে। নিয়োগদাতারা সেখান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য যাঁচাই করে নেবেন।

১১. বিদেশী মানেই ভাল ও সুপার স্কিল-এই ভুল মানসিকতা হতে এমপ্লয়ারদের বেরিয়ে আসতে হবে। উপযুক্ত যাঁচাই না করে কাউকে নিয়োগ কোনো স্মার্ট এমপ্লয়ারের কাজ হতে পারে না।

১২. আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশের মধ্যে একরকম প্রিজুডিস কাজ করে, যে তারা শিল্প কারখানার মাঠপর্যায়ে বা প্রোডাকশন ফ্লোরের কাজ করতে চান না। তারা চান, এসি রুমের এক্সিকিউটিভ জব যেটা খুবই অবাস্তব। শিল্প সেক্টরে এসে প্রোডাকশন খাতে কাজ না করে এক্সিকিউটিভ জব করতে চাইলে কেন টেকনিক্যাল পড়াশোনা করা?

মূলত তিনটি বিষয় নিয়ে কথা বলাই ছিল আমার লেখার উদ্দেশ্য। কেন বিদেশীদের হায়ার করা হয়, তার বিপরীতের যুক্তিগুলো কী কী এবং সম্ভাব্য কিছু করনীয় সম্পর্কে আলাপ করা। আমাকে লেখাটি লিখতে তথ্য বা মতামত দিয়ে সাহায্য করেছেন অনেকে। তাদের সকলকে একযোগে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। মূলত, সমস্যাটি একটি বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা। আমাদেরকে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাশাপাশি শিল্পের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির স্বার্থে একজন শিল্পপতি যা কিছু করনীয় সবই করবেন। তার সেই লক্ষ্য পূরনে যেরকম কর্মী দরকার তিনি তা হায়ার করবেন, সেখানে দেশী বা বিদেশী বিচার তার জন্য মূখ্য নয়। আমাদের করনীয় হল, নিজেদের দক্ষ করা, প্রোফেশনাল করা। তবেই আর বিদেশ হতে লোক হায়ার করতে হবে না।


লেখক : এইচআর/এডমিন পরামর্শক, ক্যারিয়ার কাউন্সিলর, লেখক


 

Write a comment

Print Friendly, PDF & Email

এই বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ



error: Content is protected !!