ঢাকা বৃহস্পতিবার, মে ২৩, ২০১৯



পোশাক শ্রমিক আলেয়া, এক আলোকবর্তিকার নাম

মোঃ সাহাব উদ্দিন: একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশকে ইউরোপ-আমেরিকাতে উপস্থাপন করলেই তারা বলতো- “ব্যাংলাডেশ!! হোএয়ার ইজ ইট ম্যান?”। কিন্তু এখন? ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন তারাই বলে “ওহ রিয়েলী!! আই লাভ ব্যাংলাডেশ ফর প্রডিউসিং সাচ লাভলী ড্রেসেস!” শুধু ক’টা শব্দই পরিবর্তন হয়নি, পাল্টেছে অনেক কিছু। দেশের পোশাক খাত আমাদের দিয়েছে সম্মানের এক পরিচয়।

বলতে দ্বিধা নেই যে, যথেষ্ট সুনামের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের রপ্তানী আয়ের প্রধান উৎস-তৈরি পোশাক শিল্প। আজ বাংলাদেশের এই  সোনালী দিনে আনার পেছনে যাদের প্রধান অবদান, তারা হচ্ছেন আমাদেরই শেফালী, রহিমা, সুমি ও বিউটির মতো লাখো নারী শ্রমিক যাদের ৭০ শতাংশই গ্রাম থেকে উঠে আসা নিরীহ ও অদম্য পরিশ্রমী। গার্মেন্টস সেক্টরে যত নারী শ্রমিক কাজ করে তার অধিকাংশ মেয়েরই অতীত অত্যন্ত বেদনাদায়ক । ছোট বেলা থেকেই একটি মেয়ের স্বপ্ন থাকে লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াতে,হতে চায় আত্মনির্ভশীল।

পোশাক শ্রমিক আলেয়া। ছবি : সাহাব উদ্দিন

আসলে সবাই কি লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে ? –না। আমাদের বেশির ভাগ মা-বোনের জীবনেই অভাব নামক কুৎসিত শব্দটা সবর্দা পেছন থেকে পেছনের দিকে টানতেই থাকে। অনবরত এই পিছুটানের কাছে আমাদের একদিন পরাজিত হতেই হয়। এরপর শুরু হয় পরের গল্প; মোচনপর্ব। যারা টিকে থাকতে পারে, ধৈর্য্যের পরিচয় দিতে পারে, শেষ হাসিটা তাদেরই।

আজ এমন একজন নারী যোদ্ধার কথা বলবো যে হারকে হার মানিয়ে দিয়েছে তার পরিশ্রম দিয়ে, ধৈর্য্য দিয়ে। না, এটা কোন নাট্যকারের নাট্যাংশ নয়, বানানো কোন কল্পও নয়। আমার নিজের চোখে দেখা, বাস্তব। জেনে সবাইকে জানানোর ইচ্ছায় আরএমজি টাইমস-এর স্মরণাপন্ন হয়ে সে সমস্ত নারীদের প্রতি সম্মান জানানো যারা বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে মাথা উচু করে দাঁড়াতে যুগিয়েছে সাহস।

মেয়েটির নাম আলেয়া, কুমিল্লা জেলার অঝোয়া নামক একটি ছোট্ট আর সবুজে ঘেরা  গ্রামের নিন্মবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। ২০০৫ সালে ১৪ বছর বয়সে ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে  থাকা অবস্থায় বাবা-মা পারিবারিক অভাব-অনটনের কারনে তাকে বিয়ে দিয়ে দেয় একই গ্রামের একটি ছেলের সাথে। বিয়ের পরবর্তিতে তার  লেখাপড়ার সুযোগ হয়ে উঠেনী আর। বিয়ের ২ বছর পর তার ঘরে ফুটফুটে একটি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। সংসারের কথা চিন্তাকরে এক বছরের সন্তানকে গ্রামের বাড়িতে রেখে চাকুরীর উদ্দেশ্যে নারায়ণগঞ্জে চলে আসে সে।

সংসারের তিন বছরের মাথায় আলেয়াকে রেখে তার স্বামী তাকে না জানিয়ে আরেকটি বিয়ে করে। শুধু তাই নয় অচেনা, অবুঝ আর গ্রাম থেকে উঠে আসা নিরীহ আলেয়াকে বাড়িতে একা ফেলে রেখে তার স্বামী চলে যায়।

বেঁচে থাকার তাগিদে বাড়ির পাশে এক গার্মেন্টস ফাক্টরীতে সুইং হেলপার হিসেবে চাকুরী নেয় আলেয়া। অধিকাংশ দিনই দুপুরে খাবার খাওয়া হতো না তার কারণ একদিকে এক বছরের ছেলেকে বাড়িতে রেখে একা থাকা, অপরদিকে তাকে একা রেখে স্বামীর চলে যাওয়া, আবার সংসারের অভাব অনটন তো রয়েছেই। কোন অবস্থাতেই বিষয়গুলো মেনে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠছিল না। দিন যায়- রাত আসে, এভাবেই চলতে থাকে আলেয়ার অন্ধকারময় জীবন।

ধীরে ধীরে কাজ শেখার পর সুইং সহকারী অপারেটর থেকে অপারেটর হওয়ার সুযোগ পায় আলেয়া। যদিও এই অপারেটর হওয়ার পিছনে রয়েছে সীমাহীন ধৈর্য্য ও কাজ শেখার অধীর আগ্রহ। অপারেটর হিসেবে  কিছু সময় পার হওয়ার পর থেকে আলেয়াকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

নারায়নগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের ভূলতায় অবস্থিত দেশের স্বনামধন্য, শতভাগ রপ্তানীমুখী ও শতভাগ কমপ্লায়েন্স এর নিয়ম-নীতিতে গড়া এক আধুনিক তৈরী পোশাক কারখানা মাইক্রো ফাইবার গ্রুপের এ-ওয়ান পোলার লিমিটেড- এ সুইং পিচরেট অপারেটর হিসেবে  সে দীর্ঘ ৭ বছর ধরে কর্মরত রয়েছে। সে প্রায় তিন বছর আগে তার নিজ গ্রামে দশ কাঠা জমি ক্রয় করে নিজের মত করে স্বপ্নের বাড়িও নির্মাণ করেছে। সম্প্রতি সে আরও এক বিঘা আবাদী জমি ক্রয় করেছে ফসলাদি ফলানোর জন্য।

এটাই শেষ নয় সে প্রতি মাসে তার অসুস্থ্য বাবা-মায়ের খাবার খরচ ও ঔষধ কেনার জন্য যাবতীয় খরচ পাঠায়। তার ছেলেটিও এখন বেশ বড় হয়েছে, বয়স তার দশ বছর । এই ছেলেটিই তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। তাকে ঘিরেই আজ আলেয়ার যত স্বপ্ন।

আজ তার পরিবারে কোন অভাব নেই, অর্থাৎ চলার জন্য যতটুকু মাসে যে অর্থ প্রয়োজন তা মিটিয়েও কিছু অর্থ সঞ্চয় করতে পারছে। জানা গেছে, তার স্বামী আবার একটি বিয়ে করেছে। সৃষ্টিকর্তার কাছে এখন তার একটাই প্রার্থনা সৃষ্টিকর্তা যেন তাকে সুস্থ্য রাখেন এবং তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন তার ছেলেটিকে যেন মানুষের মত মানুষ করতে পারেন।

আজও আলেয়া তার জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়নি, মেনে নেয়নি ব্যর্থতার অলীক আচ্ছাদন। বরং সে আজ আলোকবর্তিকা হয়ে  বাংলাদেশের সকল নারীদের আশার পথ দেখিয়েছে, করেছে উৎসাহিত।

আলেয়ার মত আজ হাজারো নারী গার্মেন্টস সেক্টরে সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের ঘাম বৃথা যেতে পারেনা, যায়ওনি। বাংলাদেশ আজ এই আলেয়াদের ওপর ভর দিয়েই পেয়েছে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা।

আলেয়ার মতো নাম না জানা আরও ৩০ লক্ষ নারী পোশাক শ্রমিক তথা এসব আলোকবর্তিকাদের হাত ধরে এগিয়ে যাক দেশের তৈরি পোশাক খাত, এগিয়ে যাক দেশ। একদিন আলেয়াদের পরিচয়েই পরিচিত হবো আমরা, আলোকিত হবে গোটা দেশ।


মোঃ সাহাব উদ্দিন

হেড অব হেইচ আর (এডমিন এ্যান্ড কমপ্লায়েন্স)

মুরানো টেক্স,

হবিরবাড়ি, ভালুকা, ময়মনসিংহ।

 

 


 

 

 


আর্কাইভ