ঢাকা শুক্রবার, জুলাই ২০, ২০১৮



আইনী পরামর্শ: প্রসুতিকালীন ছুটির কারণে ছাঁটাই!

ড. উত্তম কুমার দাস : ভদ্র মহিলা একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তিনি প্রসূতিকালীন ছুটি শেষে কাজে ফিরলে তাঁকে জানানো হয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানে ‘রি-ওর্গানাইজড’ চলছে। তাঁর পদ থাকছে না, তাই তাঁকে ছাঁটাই করা হবে। এই ক্ষেত্রে করণীয় কি?

পরামর্শ:

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান হলেও শ্রমিক ও কর্মচারী নিয়োগ ও তাদের চাকরীর শর্তাবলী বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে।

আলোচ্য ঘটনায় (যা ই-মেইল যোগে জানানো হয়েছে) কয়েকটি বিষয় বিবেচ্য:

(১) প্রথমে দেখতে হবে উক্ত নারী শ্রমিক (শ্রম আইন অনুসারে মহিলা শ্রমিক) যে প্রসূতিকালীন ছুটি ও সুবিধাভোগ করেছেন তা আইনানুযায়ী যথাযথ হয়েছে কি না [শ্রম আইনের ২(৩৪) ধারা এবং তৎসহ চতুর্থ অধ্যায়]।

(২) কোন প্রতিষ্ঠান তার ব্যবসা-বানিজ্য ও কৌশলগত কারণে তার কোন বিভাগ, শাখা বা পদ ‘রি-ওর্গানাইজড’ বা পুনর্গঠন করতে পারে। সেভাবে প্রয়োজনে কোন শ্রমিক বা কর্মীকে ছাঁটাইও করতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে বিবেচ্য হবে তা যথাযথ আইনী- প্রক্রিয়া অনুসরণ করে করা হয়েছে কি না। ছাঁটাই-প্রক্রিয়া শ্রম আইনের ২০ ধারা এবং বিধি ২৭- তে বর্ণিত হয়েছে।

(৩) এইক্ষেত্রে দেখতে হবে, উক্ত প্রতিষ্ঠান যে কারণে কথিত পদ ছাঁটাই করতে যাচ্ছে বা করেছে তা যৌক্তিক ও আইনানুগ কি-না। এর জন্য শুরুতে দেখতে হবে প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান চাকরী বিধিমালা এবং পদ-কাঠামো (ওর্গানোগ্রাম) আছে কি- না এবং তা যথাযথভাবে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত কি-না। একইভাবে প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো, যার আওতায় কথিত পদ ছাঁটাইয়ের কথা আসছে, তা অনুমোদিত হয়েছে কি- না (চাকরী বিধির সংশোধন হিসেবে)। ছাঁটাইয়ের ঘটনা আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে প্রতিষ্ঠানকে তখন সব কিছু দেখাতে হবে।

(৪) যদি দেখা যায়, শুধুমাত্র উক্ত নারী-কর্মীর (বা তার মত অন্যদের) পদই ছাঁটাইয়ের আওতায় আনা হয়েছে, তা হলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে তা বৈষম্যমূলক। প্রসূতি হওয়ার কারণে (বা ছুটিতে যাওয়ার কারণে) তাঁদের ছাঁটাই করা হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে উক্ত নারী-কর্মী প্রসূতি হওয়ার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ তুলে শ্রম আদালতে প্রতিকার চাইতে পারেন। এই ক্ষেত্রে ছাঁটাই নোটিশ জারী হলে তা রদ ও রহিত করা এবং চাকরীতে পুনর্বহাল প্রার্থনা করা যাবে। শ্রম আইনের ২(৬৫), ২(৩৪), ৫০, ২১৩ এবং ৩৪৫ ধারার বরাতে এই আইনী প্রতিকার চাওয়া যাবে। (প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আইনের ধারার প্রয়োগ হবে)।

(৫) আর কথিত বৈষম্য কাগজপত্রে সুস্পষ্ট হলে সাংবিধানিক অধিকার লংঘনের অভিযোগে রিট আবেদনের মাধ্যমে মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগেও প্রতিকার প্রার্থনা করা যেতে পারে।

আর কে শ্রমিক হিসেবে শ্রম আইনের সুরক্ষা ও সুবিধা পাবেন তা শুধুমাত্র শ্রম আইনের ২(৬৫) ধারা নয় বরং প্রাসঙ্গিক বিষয়ে মাননীয় উচ্চ আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের আলোকে দেখতে হবে। এই ক্ষেত্রে উচিত হবে শ্রম আইনে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কোন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া।

দ্রষ্টব্য: উপরোক্ত বর্ণনা প্রাপ্ত ঘটনার আলোকে একজন আইনজীবীর মতামত মাত্র, যা একান্তভাবে তাঁর ব্যক্তিগত মত। এর সঙ্গে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। এইক্ষেত্রে একমাত্র উপযুক্ত আদালত যথাযথ ব্যাখ্যা ও প্রতিকার দিতে পারেন।

লেখক: এডভোকেট, হাইকোর্ট বিভাগ, সুপ্রীম কোর্ট অব বাংলাদেশ।

ফোন- ০১৭৫৬ ৮৬৬৮১০, ই-মেইল: advocateudas@gmail.com

Write a comment

Print Friendly, PDF & Email

এই বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ



error: Content is protected !!