জব সেক্টরে সিনিয়রদের দায়বদ্ধতা

মোঃ ওয়ালিদুর রহমান বিদ্যুৎ: বাংলাদেশে ২৬ লাখ বেকার। ১৭ কোটি জনসংখ্যা হলে এটা মোট মানুষের প্রায় ১০ শতাংশ। পাশাপাশি সীমিত কর্মসংস্থান, অস্থির জব মার্কেট আর বেড়ে চলা প্রতিযোগীতার কারনে প্রতিনিয়তই জব মার্কেটে নাম লেখাচ্ছেন চাকুরীরত বা চাকুরীচ্যুত জুনিয়র, মধ্যম ও সিনিয়র মোস্ট কর্মীরা। এর সঙ্গে রয়েছে বিপুল সংখ্যক ফ্রেশার প্রার্থী প্রতিবছর যারা প্রায় ৭ লাখ যুক্ত হচ্ছেন জব মার্কেটে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বিপরীতে প্রতিবছর চাকরী সৃষ্টি হচ্ছে বা খালি হচ্ছে খুব সামান্য। তার উপরে বিগত কয়েক বছরে প্রাইভেট সেক্টরে জব সিকিউরিটি ও ক্যারিয়ার ইনস্ট্যাবিলিটির কারনে মানুষের ভিতরে জব বদলাবার প্রবণতা অনেক বেড়েছে। সবমিলিয়ে জব সেক্টরের অবস্থা খুব টালমাটাল। এই মানুষেরা নিজেদের মতো করে নানা মাধ্যমে চেষ্টা করছেন নিজেদের ক্যারিয়ার সাসটেইন করতে, এগোতে। বিশেষত ফ্রেশাররা আছেন সবচেয়ে বড় বিপদে। জাতীয় ভুল শিক্ষাক্রম, শিক্ষাপদ্ধতি ও শিক্ষানীতির শিকার হয়ে ভুড়ি ভুড়ি মাস্টার্স, এমবিএ, পিজিডি করা চাকুরীপ্রার্থীরা অন্তত যেনতেন করে হলেও যা কিছু একটার আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। আমি তাদের কষ্ট ও বেদনাটা নিজের হৃদয় দিয়ে অনুভব করি। আমি নিজেই ওই তীব্র দুর্দিনের শিকার হয়েছি আমার ছাত্রজীবনের অবসানে। এই বিপুল জনগোষ্ঠী যাদের মধ্যে কাজ জানা, অভিজ্ঞ সিনিয়ররাও আছেন, তারা তাদের কাঙ্খিত জবের আশায় নানাভাবে ফ্রাস্ট্রেটেড। এখানে উল্লেখ্য যে, নিজ নিজ প্রোফেশনে কেউ দক্ষ হলেও অবশ্যম্ভাবিভাবে তিনি নেটওয়ার্কিং ও কমিউনিকেশনে তুখোড় হবেনই এটা একদম গ্যারান্টেড নয়। ফলে ক্যারিয়ারের শুরুতে, মধ্যে, টপে থেকে চাকুরীপ্রার্থী মানুষ সুযোগের আশায় অত্যন্ত দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন। এই দুরবস্থার অবসান কোনো ফেরেশতা এসে করে দিয়ে যাবেন না। যা কিছু করার, আমরা যারা কর্পোরেটে আছি, তাদেরই করতে হবে। এক্ষেত্রে জবে বা বিজনেসে কিংবা বিভিন্ন সেক্টরে সুবিধাজনক ও উঁচু পজিশনে থাকা সিনিয়রদের দায়ীত্ব অনেক বেশি। এটা তাদের নৈতিক দায়ীত্ব, জব সেক্টরের বিপদে পড়া মানুষদের জন্য কিছু করা। সেটা যে অবশ্যই চাকুরী ম্যানেজ করে দেয়াই হবে-এমনটা নয়। প্রত্যেকে তাদের অবস্থান হতে কিছু না কিছু করতে পারেন, যেমন:-

১. সিনিয়ররা ফ্রেশার ও জুনিয়রদের সবচেয়ে বড় যে সাহায্য করতে পারেন সেটি হল, তাদের সাথে নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময়। প্রফেশনাল, এডুকেশনাল, এমনকি পার্সোনাল এক্সপিরিয়েন্স বিনিময় জুনিয়রদের করবে সমৃদ্ধ। ফরমাল ক্লাসরুম, ওয়ার্কশপ, ব্লগে লেখা, ওয়েবসাইট, ফেসবুক লাইভ, ভিডিও টিউটোরিয়াল, গ্রূপ ডিসকাশন এর মাধ্যমে অভিজ্ঞ ও ফ্রেশার-সবার জন্য অবদান রাখতে পারেন তারা।

২.বুক পাবলিশিং: প্রোফেশনাল ও নন প্রোফেশনাল আইডিয়া নিয়ে কমার্শিয়ালী বই পাবলিশ করতে পারেন তারা। আমাদের দেশে এখনো প্রজন্ম হতে প্রজন্মে প্রফেশনাল আইডিয়া ট্রান্সমিট হয় সরাসরি কাজে থাকার মধ্য দিয়ে। এতে করে শুধু একজন সিনিয়র প্রফেশনালের নিজস্ব ঘরানার মানুষেরাই তার জ্ঞান ও শিক্ষাকে জানার সুযোগ পান। কিন্তু একজন অভিজ্ঞ ও মাঠপর্যায়ে কাজ করে উপরে উঠে আসার সিনিয়র কর্মীর অভিজ্ঞতাকে বইয়ের মধ্য দিয়ে ধরে রাখার গুরুত্ব অনেক।

৩.প্লাটফর্ম: ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টে আগ্রহী-বাঁছাই করা এমন ফ্রেশার বা প্রোফেশনালদের নিয়ে একটি ওয়ার্কিং গ্রূপ করতে পারেন তারা। যার লক্ষ্য হবে শুধুমাত্র ক্যারিয়ার স্কীল উন্নয়ন। আমাদের দেশে প্রচুর প্লাটফরম হয়ে গেছে এমন উদ্দেশ্য নিয়ে। ছড়ানো ছিটানো প্রচুর অফ ও অনলাইন প্লাটফরম হওয়ায় অনৈক্য ও বিভেদ বাড়ছে। পাশাপাশি সাহায্য প্রার্থী ও প্রোফেশনালরা বিভক্ত হয়ে যাাচ্ছেন। সবাইকে কমোন প্লাটফর্মে আনাটা জরুরী।

৪.জব লিংকিং: চাকরী চান বা কর্মী চান-এমন মানুষদের মধ্যে লিংক আপ করার ভিতর দিয়েও সিনিয়র প্রফেশনালরা সমাজ ও শিল্পের জন্য অবদান রাখতে পারেন। দেশে ২৬ লক্ষ বেকার মানুষ। তার বিপরীতে কর্পোরেটগুলো উপযুক্ত লোক পাচ্ছে না। উভয় দিকেই ক্ষতি অনেক। উপযুক্ত কর্মীকে উপযুক্ত এমপ্লয়ারের সাথে লিংক করিয়ে দিতে পারলে সময়, এনার্জি, অর্থ, স্পিরিট এর অপচয় কমে যেত। অন্তত, ব্যস্ত কর্পোরেটরা তাদের নজরে পড়া যেকোনো জব সার্কুলার তাদের ফেসবুক/লিংকডইন পেজে ক্রমাগত শেয়ার দিতে থাকলেও অনেক কাজ হত। ভিতরে ভিতরে নিজের চেনা মানুষদেরই শুধু জব দিতে থাকলে, সেটা জব মার্কেটে বৈষম্য ও বঞ্চনা বাড়াবে। যোগ্যতমের অধিকার ক্ষুন্ন হবে।

৫.পরামর্শ: একজন অভিজ্ঞ ও সিনিয়র প্রফেশনাল ওপেন ফোরামে পরামর্শ/হোমওয়ার্ক/ডকুমেন্টেশন/প্ল্যানিং হেল্প দিতে পারেন, সাহায্য নিতে চান-এমন মানুষ বা প্রতিষ্ঠানকে। সেটা হতে পারে কমার্শিয়ালি বা ফ্রি।

৬.ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং: আমাদের দেশে প্রচুর মানুষ সঠিক ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এর অভাবে ভুল পথে চালিত হন, ভুল ক্যারিয়ার নিয়ে সময় নষ্ট করেন, কোন সময়ে, কবে, কখন, কীভাবে, কী করতে হবে-সেই সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে অনেকেই তাদের ক্যারিয়ারের ক্ষতি করেন। একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ ক্যারিয়ার কাউন্সেলরের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারলেও সমস্যা অনেকখানি সমাধান হত।

৭.প্রশিক্ষণ: সিনিয়র প্রোফেশনালরা তাদের নিজের নিজের দক্ষতাকে অনলাইন স্কুল, ভিডিও টিওটোরিয়াল, ফেসবুক লাইভ, ক্লাস লেকচার, নলেজ শেয়ারিং সেশন, হ্যান্ড আউট, পাওয়ার পয়েন্ট ইত্যাদির যেকোনো একটির মাধ্যমে বিনামূল্যে কিংবা স্বল্পমূল্যে শেয়ার করে জব মার্কেটে থাকা মানুষের দক্ষতা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কনফিডেন্স বাড়ানোর জন্য কার্যকর অবদান রাখতে পারেন। বিশেষত কিছু কিছু কমোন স্কিল বাড়াতে যেমন-ইংরেজি, কম্পিউটার নলেজ, ইন্টারভিউ ফেসিং, কনফিডেন্স গ্রোইং, এক্সপোজার বিল্ডিং এগুলো নিয়ে কাজ করা দরকার। আমাদের এখানে প্রচুর প্রশিক্ষণ হচ্ছে। আমার কেন যেন মনে হয়, এর মধ্যে কাজের কাজ হচ্ছে খুব কম। একই ট্রেইনিং বারবার হচ্ছে, অপেক্ষাকৃত কম জরুরী বা প্রায়োরিটি লিস্টে পেছনে থাকবে-এমন বিষয় নিয়ে সবাই কাজ করছে, এনার্জি ও অপর্চুনিরি অপচয় হচেছ। প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণের সুযোগের বেস্ট ইউটিলাইজেশন করা দরকার।

৮.কালচারাল উন্নয়ন: সিনিয়র মোস্ট প্রোফেশনালরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের এইচআর সিস্টেম উন্নয়নে কাজ করা উচিৎ। তারা এইচআরের মানুষ না হলেও। আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বলে, বাংলাদেশের একটা বড় সংখ্যক প্রতিষ্ঠান এমনকি সেমি-মাল্টিন্যাশনাল বা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীরও এইচআর সিস্টেম অত্যন্ত মানহীন। তাদের রিক্রূটমেন্ট, সিলেকশন, প্লেসমেন্ট, পিএমএস, জব এলিমিনেশন-বেশিরভাগই সেঁকেলে। তার উপরে আছে তাদের এইচআরে কাজ করা মানুষদের নিচু মান। ফলাফল, এমপ্লয়ী হ্যারাসমেন্ট ও কর্পোরেট গ্রীভ্যান্স। আমি নিজে দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের টপ ম্যানেজমেন্ট তাদের সিস্টেমের ও এইচআরের এই ল্যাকিং নিয়ে অন্ধকারে আছেন। সিনিয়র প্রোফেশনালরা আর কিছু না পারেন, নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের এইচআর সিস্টেম উন্নয়নে মালিক ও এইচআরকে উদ্বুদ্ধ ও সহায়তা করতে পারেন। তাতেও অন্তত বাজারে পজিটিভ ইমপ্যাক্ট পড়বে।

সবচেয়ে বড় প্রেক্ষিত হল, খারাপ অবস্থা যে কারো যে কোনো সময় আসতে পারে। আমি প্রচুর সিনিয়র প্রোফেশনালকে চিনি, যারা ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করার পরেও আজ চাকরী খুঁজতে নেমে পেরেশান। পরিবার, বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে অমানবিক পরিস্থিতিতে আছেন। তাই এগিয়ে আসি আমার যতটুকু করার ক্ষমতা আছে-সেটা নিয়ে। আজ আমি যদি আসি, কাল আমিও কাউকে পাশে পাব।

লেখক: HR/Admin পরামর্শক, ক্যারিয়ার কাউন্সেলর ও লেখক

Write a comment

Print Friendly, PDF & Email

এই বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ



error: Content is protected !!