ঢাকা সোমবার, মে ২৮, ২০১৮



কল্যাণ কর্মকর্তা ও অংশগ্রহণকারী কমিটির গুরুত্বঃ আমাদের অবস্থান

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল:  লোকমুখে একটা কথা প্রচলিত আছে আর তা হল “পাগলও নিজের ভাল বোঝে” ! কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কিছু কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হয়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা নিজেরা নিজেদের ভাল বুঝেও বুঝিনা, কিংবা আমরা কিছু কিছু বিষয় নিয়ে শঙ্কিত যার ফলে আমরা তার ধারকাছ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করিনা। আমি আজ এ সংক্রান্ত ২ টি উদাহরণ দেবো প্রথমটি হল কল্যাণ কর্মকর্তার বিষয়ে আর দ্বিতীয়টি অংশগ্রহণকারী কমিটি বা পিসি কমিটি বিষয়ে।


প্রথমে কল্যাণ কর্মকর্তার বিষয়ে বলি তার আগে উল্লেখ করা উচিৎ আইন কি বলছে?

২০১৫ সালে প্রকাশিত রুল এর ধারা ৭৯ মোতাবেক;

“ কোন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে উহাতে নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা ৫০০ জন বা ততোধিক থাকিলে এবং চা- বাগান বা অন্যান্য বাগানের ক্ষেত্রে শ্রমিকের সংখ্যা ৫০০ জন বা ইহার অধিক হইলে একজন যোগ্যতাসম্পন্ন কল্যাণ কর্মকর্তা থাকিতে হইবেঃ

তবে শর্ত থাকে যে, শ্রমিকের সংখ্যা যদি দুই হাজারের অধিক হয় তাহা হইলে, প্রতি দুই হাজার এবং অতিরিক্ত ভগ্নাংশের জন্য একজন করিয়া অতিরিক্ত কল্যাণ কর্মকর্তা নিয়োগ করিতে হইবে”

আর তার কাজ হিসাবে দেয়া আছে;

(ক) শ্রমিকদের বিভিন্ন কমিটি ও যৌথ উৎপাদন কমিটি, সমবায় সমিতি ও ওয়েলফেয়ার কমিটি গঠনকে উৎসাহিত করা এবং তাহাদের কাজকর্ম তদারক করা;

(খ) বিভিন্ন সুযোগ সুবধা যথা ক্যান্টিন, বিশ্রামাগার, শিশুকেন্দ্র, পর্যাপ্ত শৌচাগারের ব্যবস্থা, পানীয়-জল, ইত্যাদির প্রতি লক্ষ্য রাখা;

(গ) সবেতন ছুটি মঞ্জুরের ব্যাপারে শ্রমিককে সহযোগিতা করা এবং যে কোন ছুটি ও অন্যান্য নিয়ম কানুনের ব্যাপারে শ্রমিকগণকে অবহিত করা;

(ঘ) গৃহ সংস্থান, খাদ্য, সমবায় সমিতিতে ন্যায্য মূল্যের যে কোন প্রতিষ্ঠানে সামাজিক ও বিনোদনমূলক সুযোগ-সুবিধা, স্বাস্থ্য রক্ষা ব্যবস্থা, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ, ইত্যাদি শ্রম কল্যাণমূলক বিষয়ের উপর লক্ষ্য রাখা;

(ঙ) শ্রমিকদের কাজের ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও তাহাদের কল্যাণের বিষয়ে সচেষ্ট থাকা ও সুপারিশ করা;

চ) নবাগত শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দান, শ্রমিকদের শিক্ষার মান উন্নয়ন ও কারিগরি ইনস্টিটিউটে তাহাদের প্রশিক্ষণে যোগদানের উৎসাহ ও মনোনয়ন প্রদানে কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ প্রদান;

(ছ) প্রতিষ্ঠানে আইনের বিধানাবলি বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকগণকে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান;

(জ) শ্রমিকদের অধিকতর চিকিৎসা সুবিধার জন্য কারখানা বা প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল অফিসারের সহিত যোগাযোগ রক্ষা;

(ঝ) শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক উন্নয়নরে জন্য পদক্ষপে গ্রহণ করা;

(ঞ) মজুরি ও চাকরির শর্তের বিষয়গুলি সম্পর্কে মালিকপক্ষ ও শ্রমিকদের প্রতিনিধির সহিত আলোচনা;

(ট) মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিলে সে বিষয়ে আপোসমীমাংসার জন্য দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করা ;

(ঠ) শ্রমিকদের বক্তব্য অনুধাবন করা এবং পারস্পরিক মতপার্থক্য দূর করিবার জন্য মালিক ও শ্রমিকদেরকে সহায়তা করা;

(ড) শ্রমিকদের একক বা সমষ্টিগত কোন অনুযোগ থাকিলে, সেইগুলি ত্বরিৎ নিষ্পত্তির জন্য কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত করা; এবং

(ঢ) কারখানা বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এবং শ্রমিকদের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক রক্ষার জন্য সংযোগ স্থাপন ও আলোচনা অনুষ্ঠান।

উপরে উল্লেখিত কাজ বিবেচনা করলে আর একটু বাস্তবিক চিন্তা করলে যে কেউ বুঝতে পারবেন যে, আসলে ৫০০ থেকে ২০০০ শ্রমিক যদি একটি ফ্যাক্টরীতে থাকে তবে সেখানে ১ জন কল্যাণ কর্মকর্তা দিয়ে তার কাজের কতটুকু বাস্তবায়ন করা সম্ভব! আমাদের মনে রাখা উচিৎ আইন অধিকাংশ ক্ষেত্রে নুন্যতম করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দেয়, তাই বলে এই না যে আইনে শ্রমিক কল্যাণ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে যে নির্দেশনা দেয়া আছে তাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। হ্যাঁ আপনি আইনে যা লেখা আছে তার কম কোন সুবিধা দিতে পারবেন না কিন্তু বেশী দিলে লাভ বৈ ক্ষতি নেই।

অংশগ্রহণকারী কমিটি বিষয়ে বলতে গেলে প্রথমেই ক্রেতাদের চাহিদার বিষয়ে বলতে হয় , সকল ক্রেতাদের একটি অভিষ্ট চাহিদা হল ফ্যাক্টরীগুলোতে দল গঠনের স্বাধীনতা যাকে আমরা ইংরেজীতে ফ্রিডম অফ এসোসিয়েশন বলে থাকি। ট্রেড ইউনিয়ন বা অংশগ্রহণকারী কমিটি যাই হোক না কেন, ক্রেতারা চায় শ্রমিকরা যেন যৌথ দর কষাকষির সুযোগ পায়। আর সেজন্য শ্রমিকদের মনোনীত প্রতিনিধিত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের সিংহভাগ ফ্যাক্টরীতে যেহেতু অংশগ্রহণকারী কমিটির প্রচলন তাই এই বিষয়েই আলোচনা করা যাক। ২০১৫ সালে প্রকাশিত রুল এর ধারা ১৮৩ মোতাবেক;

“অন্যূন পঞ্চাশ জন স্থায়ী শ্রমিক কর্মরত রহিয়াছে এমন প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের মালিক উক্ত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হইবার পরবর্তী ৩ (তিন) মাসের মধ্যে সেখানে একটি অংশগ্রহণকারী কমিটি গঠন করিবেন।”

আর অংশগ্রহণকারী কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একই রুলের ধারা ১৮৭ তে বলা হয়েছে “যে প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন বা যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধি (সিবিএ) নাই সেই ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ শ্রম পরিচালককে অবহিত করিয়া গোপন ব্যালটের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী কমিটির শ্রমিক প্রতিনিধি নির্বাচনে প্রয়োজনীয় সহায়তা করিবে।”

আর অংশগ্রহণকারী কমিটির কাজ বিষয়ে শ্রম আইন ২০০৬ যা বলা হয়েছে তা হল;

“ প্রধানত প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রমিক এবং মালিক সকলেরই অংগীভুত হওয়ার ভাব প্রোথিত এবং এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রমিকগণের অঙ্গীকার ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা বিশেষ করিয়া-

১. শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস , সমঝোতা এবং সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালানো

২. শ্রম আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা

৩. শৃঙ্খলাবোধে উৎসাহিত করা, নিরাপত্তা পেশাগত স্বাস্থ্য রক্ষা এবং কাজের অবস্থার উন্নতি বিধান ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা

৪. বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ , শ্রমিক শিক্ষা এবং পরিবার কল্যাণ প্রশিক্ষণে উৎসাহিত করা

৫. শ্রমিক এবং তাহাদের পরিবারবর্গের প্রয়োজনীয় কল্যাণমূলক ব্যবস্থাসমূহের উন্নয়নের লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহন করা

৬. উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি , উৎপাদন খরচ হ্রাস এবং অপচয় রোধ করা এবং উৎপাদিত দ্রব্যের মান উন্নত করা”

আইনকে সম্মান জানিয়ে ও প্রয়োজনের গুরুত্ব অনুধাবন করে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের আয়োজন করলেও অনেকেই আজও নির্বাচনের বিরোধিতা করে আসছে। কিন্তু আমরা যদি শ্রমিক প্রতিনিধিদের কাজ যা আইনে বলা আছে তা ভালভাবে পর্যালোচনা করি তবে একটি কার্যকরী অংশগ্রহণকারী কমিটি যে প্রতিষ্ঠানের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে তা নিশ্চয় অনুধাবন করতে পারবো।

কেন শুধু আইনে উল্লেখিত সংখ্যক কল্যাণ কর্মকর্তা নিয়োগ করা হচ্ছে ও শ্রমিক প্রতিনিধিত্বের জন্য নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট অনীহা রয়েছে তার মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায় যে,

১. তারা এর গুরুত্ব অনুধাবন করেনি

২. তাদের কাছে যারা বার্তাটি পৌঁছিয়ে দেবে তারা সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারছেন না কিংবা করলেও কর্তৃপক্ষ তা আমলে নিচ্ছেন না

৩. কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের ভয়

৪. ওয়েলফেয়ারের ক্ষেত্রে বিশেষ করে অনেকে মনে করেন এটি একটি বাড়তি খরচ!

এখন এই কল্যাণ কর্মকর্তা বা অংশগ্রহণকারী কমিটির দায়িত্ব ভালভাবে বিবেচনা করলে একটি কমন বিষয় আমরা অনুধাবন করতে পারি আর তা হল, এরা দুজনেই মালিক শ্রমিকের মাঝে একটি সেতু হিসাবে কাজ করার কথা। যদি তাই হয় তাহলে তাদের দ্বারা অকল্যাণমূলক কোন কর্মকাণ্ড কি আসলেই হতে পারে? যদি তেমনটি হয়েই থাকে তবে কেন হচ্ছে?

হতে পারে আমি ২০০০ শ্রমিকের জন্য একজন কল্যাণ কর্মকর্তা রেখেছি যার একার পক্ষে এত শ্রমিকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব না তাই সে নিরুৎসাহিত হয়ে কাজে অবহেলা করছে, আর তাই স্বাভাবিক নয় কি!

হতে পারে আমি আমার কল্যাণ কর্মকর্তাকে দিয়ে তার আসল কাজ না করিয়ে অন্যান্য দায়িত্ব দিয়ে রেখেছি যা তার সাথে শ্রমিকদের একটি ব্যবধান সৃষ্টি করেছে। হতে পারে আমি তাকে তার মূল দায়িত্ব বুঝিয়ে দেইনি!

অংশগ্রহণকারী কমিটির ক্ষেত্রেও হতে পারে আমি তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেইনি যার ফলে তারা তাদের মূল কাজ করছেনা (মনে রাখতে হবে, আমি কার কাছে কি চাচ্ছি সে সম্পর্কে জানান দেয়া জরুরী) । হতে পারে আমি নির্বাচন আয়োজন করিনি, কমিটির সভার এজেন্ডা সংগ্রহে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করিনি এবং শুধু এক তরফা এজেন্ডা প্রস্তাব করি যার ফলে শ্রমিকদের মূল সমস্যাগুলো আমি জানতে পারছিনা। অতঃপর প্রকাশ করতে হয় তাই মিটিং এর মিনিটস নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ করি আর আমার শ্রমিকের কাছে সে বারতা পৌঁছেছে কিনা তার তোয়াক্কা করিনা! আর তাই শ্রমিকদের কমিটির প্রতি আস্থা নেই!

আমাদের মনে রাখতে হবে ফ্যাক্টরীতে অবস্থানরত শ্রমিক এবং ফ্যাক্টরীর কল্যাণ যদি আমরা আসলেই চাই তবে একটি পাকাপোক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকা জরুরী। আর সেই যোগাযোগ ব্যবস্থার মূল চাবী হল কল্যাণ কর্মকর্তা এবং অংশগ্রহণকারী কমিটি। আর এদের কার্যকরী করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরী। যে ফ্যাক্টরিগুলোতে নির্বাচিত শ্রমিক প্রতিনিধি রয়েছে আর তারা তাদের দায়িত্ব জানে সেখানে অকল্যাণকর কিছু যে হবেনা তা নিশ্চিত বলা যায়। আর যে কারখানায় গড়ে ৫০০ জন কিংবা তার কম শ্রমিকের জন্য অন্তত একজন কল্যাণ কর্মকর্তা রয়েছে যে কিনা তার দায়িত্ব জানে এবং যাকে অন্য কোন অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়না সেখানেও যে মালিক শ্রমিকের একটি শক্ত বন্ধন রয়েছে তাও নিশ্চিত (এমনও প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ শ্রমিকের জন্য একজন কল্যাণ কর্মকর্তা রয়েছে) ।

এখন আমরা আসলেই কল্যাণ চাই কিনা আর সে অনুযায়ী উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবো কিনা তা যার যার অভিরুচির উপর নির্ভর করছে! 

লেখক: মানবসম্পদ প্রশিক্ষক

Write a comment

Print Friendly, PDF & Email

এই বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ



error: Content is protected !!