ঢাকা শুক্রবার, নভেম্বর ১৬, ২০১৮



‘বন্ড’ স্বাক্ষর করলে চাকরী বদল করা যাবে কি?

ড. উত্তম কুমার দাস : জনৈক ভদ্রলোক একটি প্রতিষ্ঠানে ২০১৫ সনের ১ জুলাই যোগদান করেন। এটি একটি কারিগরি (টেকনিক্যাল) কাজে নিয়োজিত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের দেশীয় অংশীদার। এর পর নিয়োগকর্তা তাকে এমন একটি ঘোষণায় স্বাক্ষর করিয়েছে যে, তিনি ঐ প্রতিষ্ঠানে অন্ততঃ তিন বছর চাকরী করবেন। এখন তিনি গত জুলাই মাসে (২০১৭) এক মাসের নোটিশ দিয়ে পদত্যাগ করেছেন এবং আগস্ট মাসে নতুন এক জায়গায় যোগদানও করেছেন। তার আগের নিয়োগকারী ক্ষতিপূরণ দাবী করে আইনী-নোটিশ পাঠিয়েছেন। করণীয় কি?

আমরা প্রায়শই এ ধরণের সমস্যা ও প্রশ্নের সম্মুখীন হই। কোন নিয়োগপত্র বা চাকরী-সংক্রান্ত চুক্তিপত্রে এধরণের শর্ত নিয়োগকারী যোগ করে দেয়। তবে তা কতটা আইন সংগত তা সংশ্লিষ্ট আইনের নিরিখে বিচার্য বিষয়।

প্রথমেই বলে রাখা ভাল বেসরকারী খাতের নিয়োগে এমনটি করা হয়। বেসরকারী খাতের চাকরী মুলতঃ দুই আইনের আওতায় করা হয়- বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এবং চুক্তি আইন, ১৮৭২।

যারা প্রথাগতভাবে শ্রম আইনের আওতায় পড়বে তাদের চাকরীর শর্তাবলী (যেমন: কর্ম ঘণ্টা, ছুটি, ছাঁটাই, ডিসমিস, বরখাস্ত, টার্মিনেশন, পদত্যাগ, অবসর, দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ প্রভৃতি) শ্রম আইন মেনে করতে হবে।

আমাদের এখানে আরেকটি ভুল ধারণা রয়েছে- অনেকে মনে করেন- যারা কথিত মিড-লেভেল ম্যানেজার তাদের চাকরীর শর্তাবলী শ্রম আইনের আওতায় পড়বে না। এটা ভুল। নিয়োগের ধরণ ও শর্তের উপর নির্ভর করবে কোন আইন প্রয়োগ হবে। স্থায়ী কোন পদের নিয়োগ সাধারণত চুক্তি আইনে হয় না।

শ্রম আইনে শ্রমিকের সংজ্ঞা [ধারা ২(৬৫)] দেওয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় তাদের উল্লেখ করেছে। শ্রম আইনে কর্মীসহ অন্যদের নিয়োগের বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। তাতেই ধোঁয়াশা। কর্মরত ব্যক্তির ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার আর তার চাকরীর শর্তাবলী (Conditions of employment) আলাদা বিষয়। চাকরীর শর্তাবলী ছাড়া কাউকে নিয়োগ হয় কি করে?

এই বিষয়ে কিছু বিষয় বিবেচ্য- আমাদের উচ্চ আদালত থেকে একাধিক মামলায় সিদ্ধান্ত আছে যে, পদবী বিবেচনায় নয়, বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাজের ধরণ দেখে নির্ধারণ হবে কে শ্রমিক আর কে শ্রমিক নয়। এ নিয়ে মতান্তর হলে একমাত্র তথ্য ও ঘটনা বিবেচনা করে শ্রম আদালত সিদ্ধান্ত দিবেন।

আর শ্রম আইনের ধারা ৩ অনুসারে, কোন কারখানা, প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান প্রভৃতিতে নিয়োগ ও চাকরীর শর্ত সংক্রান্ত বিষয়ে শ্রম আইনের বিধান প্রাধান্য পাবে।

শ্রম আইনের (৩ ধারায়) বলা হয়েছে, যে সকল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে (শ্রম আইন) প্রযোজ্য নয় সে সকল প্রতিষ্ঠানও উক্ত আইনের প্রদত্ত কোন সুযোগ-সুবিধার চেয়ে কম সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কোন নীতি, বিধি-বিধান, হাউজ-পলিসি করতে পারবে না।
এতে করে বলা যায়, কথিত মিড-লেভেল ম্যানেজারের নিয়োগ এবং চাকরী শর্তাবলী শ্রম আইনের আলোকে হতে হবে। কর্মরত ব্যক্তিদের চাকরী ও নিয়োগ-সংক্রান্ত নিজস্ব বিধি-বিধান করার ক্ষেত্রেও শ্রম আইনের শর্ত অনুসারে তা করতে হবে। এই শ্রম আইনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ সীমিত। আর কর্মীর ক্ষতিপূরণ এবং সুযোগ-সুবিধার দায় এড়ানোর জন্য তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলেও (যেখানে বছরের পর বছর কাজ করেছেন) আইনের দৃষ্টিতে তা গ্রহণযোগ্য নয়।

আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় কোন দায়মুক্তি না থাকলে বহুজাতিক সংস্থা বা আন্তর্জাতিক এনজিওর ক্ষেত্রেও শ্রম আইন প্রযোজ্য হবে। যেমন- তাদের শ্রমিক ও কর্মীদের ছাঁটাই, বরখাস্ত, চাকরীচ্যুতি, পদত্যাগ, অবসর প্রভৃতির ক্ষতিপূরণ ও সুযোগ-সুবিধা শ্রম আইন অনুযায়ী দিতে হবে।

কোন প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণের ও সুযোগ-সুবিধার পরিমাণ শ্রম আইন নির্দেশিত বিধানের চেয়ে বেশী হলে সমস্যা নেই; কম হলেই শ্রম আইন প্রদত্ত (যা নুন্যতম) মানদণ্ড মানতে হবে। এর দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারীর। আর এহেন বিধি-বিধান শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই হবে না। আইন-বিধি নির্ধারিতই ভাবে সরকারের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর থেকে তার অনুমোদন নিতে হবে। ২০১৫ সনের ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা চালু হয়েছে।

তবে হ্যা যারা প্রথাগত শ্রমিক-সংজ্ঞার আওতায় পড়ছে না তাদের বিষয়ে শ্রম আইনে আলাদা অধ্যায়- ধারা হলে কিংবা আলাদা আইন হলে ভাল। তা না হওয়া পর্যন্ত তারা কি শুন্যে ভাসবে? তা হতে পারেনা। কেউই আইনের সুরক্ষার বাইরে থাকতে পারেনা। এইক্ষেত্রে তাদের কাছাকাছি যে আইন তার প্রয়োগ প্রাধিকার পাবে।

এবার ঐ ভদ্রলোকের কথায় যাওয়া যাক। আমাদের এখানে এ ধরণের শর্ত আরোপ করে শ্রমিক-কর্মী নিয়োগ চললেও (Restrictive Clause) তা কে চ্যলেঞ্জ করা কিংবা তা নিয়ে আদলতে যাওয়ার ঘটনা খুব একটা নেই বললেই চলে।

তবে ভারতের বিভিন্ন হাই কোর্ট এবং সুপ্রীম কোর্ট বিভিন্ন মামলার রায়ে বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিছু মানদণ্ড তৈরি করছে। যার সারমর্ম হল-

• আইনসংগত পেশা, বাণিজ্য ও ব্যবসায় নিয়োজিত হওয়া ব্যক্তির মৌলিক অধিকার;
• কোন চাকরীর-সম্পর্ক সমাপ্তির পর অন্য কোন চাকরীতে যোগদানে বাঁধাদান বেআইনী (Void)। তবে চাকরীর-সম্পর্ক চালু থাকাকালে এই বাঁধাদান বৈধ;
• কর্মীর জীবনধারনের অধিকার মুখ্য, তবে তা শর্ত সাপেক্ষ হতে পারে;
• কোন চুক্তি বা তার কোন শর্ত বিবেকবর্জিত (Unconscionable) হলে তা জননীতি-বিরুদ্ধ (Against public policy) বলে বিবেচিত হবে এবং তা বাতিল করার দায়িত্ব আদালতের।

যেমনটি আমার অন্য এক লেখায় উল্লেখ করেছি, নাগরিকের স্বাধীনভাবে পেশা ও বৃত্তি পছন্দ করা এবং জীবনধারণের অধিকারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের কিছু রায়ও প্রণিধানযোগ্য। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিত বনাম সরকার (ডিএলআর, ৫৩, ২০০১) মামলায় উচ্চ আদালত বলেছেন, জীবন ধারণ (Livelihood) থেকে বঞ্চিত করা বেঁচে থাকার অধিকার (Right to life) থেকে বঞ্চিত করার নামান্তর, যা অসাংবিধানিক ও বে-আইনী।

আমাদের সংবিধান বলপূর্বক কাউকে কোন কাজে নিয়োজিত করাকে নিষিদ্ধ করেছে (অনুচ্ছেদ ৩৪)।

তবে তা বিবেচিত হবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ঘটনা ও প্রেক্ষাপট দেখে। এই বিষয়ে কোন বিরোধ উঠলে তার সুরাহা করতে পারবেন এই বিষয়ে ক্ষমতাপ্রাপ্ত আদালত।

এই আলোচনা থেকে আশা করি বুঝতে পারছেন- কখন, কি করণীয়! ভদ্রলোকের উচিত হবে চুক্তি আইন এবং শ্রম আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ এমন কোন আইনজীবীর পরামর্শ মেনে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া।

দ্রষ্টব্য: এই লেখা শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে তৈরি। আপনার সমস্যার জন্য সংশ্লিষ্ট আইন দেখুন এবং এই বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর সংগে পরামর্শ করুন।

লেখক : আইনজীবি, সুপ্রীম কোর্ট অব বাংলাদেশ । ই-মেইলঃ ukdas1971@gmail.com

 

 

Write a comment

Print Friendly, PDF & Email

এই বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ



error: Content is protected !!