ঢাকা মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭


ন্যুনতম মজুরী নিয়ে মায়াকান্না ও অর্ধসত্য কাহিনীর বেসাতি

ওয়ালিদুর রহমান : বাংলাদেশে একটি খুব জনপ্রিয় কিন্তু সস্তা মিথ্যা কথা খুব চালু আছে এবং সেটা নিয়ে খুব প্রচারনাও আছে। “বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরের ন্যুনতম মজুরী বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক কম”-এরকম একটি আপাতঃ সত্যি তথ্য নিয়ে প্রচুর জ্ঞানী ও অতিজ্ঞানী গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য চোখের পানি ফেলেন। দিস্তা দিস্তা কলাম লেখেন। এটা বোধহয় এমন একটি একপেশে মিথ্যা যেটা মানুষ ব্যাপকভাবে পছন্দ করে-বলতে আর ভাবতে। কারন একটাই-গার্মেন্টস শিল্পের প্রতি জন্মগত প্রিজুডিস।

আমি কেন বলছি আপাতঃ সত্যি? আসুন দেখি:-
১. আয় ও প্রকৃত আয় বলে অর্থনীতিতে দু’টো কনসেপ্ট আছে।
আমাদের দেশে এক লিটারের এক বোতল পানির দাম কত? ১৫-২০ টাকা। জার্মানীতে সেটা ১০০ টাকা। মানে হল, দেশের মূল্যস্তর ও লিভিং কস্ট এর উপর নির্ভর করে প্রকৃত আয়। বাংলাদেশে তাই ১৫,০০০ টাকা আয় হলে যেই জীবন যাপন করা যায় সেটাই জার্মানীতে করতে হলে ১,৫০,০০০ টাকা লাগবে। তাই ’জার্মানীতে সবার বেতন বেশি’-এটি শুধুই একটি আংশিক সত্যি।

২.মানুষের শুধুমাত্র ইনকামের উপর তার ক্রয়সামর্থ নির্ভর করে না। ওই দেশের মুদ্রার সাথে ডলারের এক্সচেঞ্জ রেট, জিডিপি গ্রোথ, ইনফ্লেশন রেট, ফ্লো অব মানি, লিকুইড ফ্লো-অনেক কিছুই আধুনিক অর্থনীতিতে মানুষের সামর্থ্য নির্ণয়ে দরকার। ক্রয়সামর্থ ও ইনফ্লেশন রেট বিবেচনায় না নিয়ে শুধু মজুরীর হার নিয়ে কথা বলা কুমিরের কান্নার মতো। একটা উদাহরন বলি: জিম্বাবুয়েতে একজন মাটিকাটা শ্রমিকের বেতন ১০০ কোটি জিম্বাবুইয়ান ডলার। তো, সে লোকটি নিশ্চই অনেক সুখে থাকে! নাহ, তিনি ওই দেশে খুবই গরীব কারন ওখানকার সুপার ইনফ্লেশন রেট। বাংলাদেশে এটা মাত্র ৫ থেকে সাড়ে ৫% বিধায় এখানে ১০ কোটি নয়, ১০,০০০ দিয়েও ওর চেয়ে ভাল থাকা যায়।

৩.বাংলাদেশে গার্মেন্টস এত বিশাল কেন হয়েছে-তার পেছনে যতগুলি বিজনেস ফ্যাক্টর আমাদের তথাকথিত থিংকট্যাঙ্করা দেখাতে পেরেছেন তার সর্বপ্রধানটি হল সস্তা শ্রম। চায়না, ভিয়েতনাম, ফিলিপিনস, কম্বোডিয়া, বার্মা, ইন্দোনেশিয়া, ভারত- যাদের ন্যুনতম মজুরীর তুলনায় আমাদের মজুরী কম বলে এসব জ্ঞানপাপী থিঙ্কট্যাঙ্করা একতরফাভাবে প্রচার করে, সেসব দেশের সাথে আমাদের প্রতিযোগীতার প্রধানতম অস্ত্র সস্তা শ্রম। কারন অন্যান্য ফ্যাক্টরে আমরা অনেক পিছানো। এখন শুধুমাত্র ’মজুরী কম’-এইজন্য যদি মজুরী তাদের সমান বা কাছাকাছি করতে হয়, তাহলে যে একমাত্র ফ্যাক্টরে আমরা প্রতিযোগীতায় টিকে আছি সেটাও তো তাদের সমান হয়ে যায়। তাহলে জায়ান্ট চীন বা কম্বোডিয়ার সাথে টিকব কী করে? আর শিল্পটাই যদি না থাকে, তাহলে আপনাদের এসব থিঙ্কট্যাঙ্ক, গবেষণা, শ্রমিকের বেঁচে থাকাইতো অসম্ভব।

৪.চায়না বা ভিয়েতনামের চেয়ে আমাদের ন্যুনতম মজুরী কম-তাই সেটা বাড়াতে হবে ব্যপক হারে-এই কুকথা যারা নির্দিধায় বলে বা বিশ্বাস করে তাদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, চায়না, ইন্ডিয়া বা ভিয়েতনামের জিডিপি কত আর বাংলাদেশের কত? যদি আমাদেরটা অনেক কম হয়ে থাকে তাহলে একই রকম শিল্পে আমাদের মজুরী তাদের সমান করার দাবীটাইতো অন্যায্য।

৫.যাদের সাথে মজুরী তুলনা করা হচ্ছে তাদের দেশে তৈরী হওয়া প্রোডাক্টের এফওবি, সিএম আর ভ্যালু এ্যডিশনের বিপরীতে আমাদের এখানকার গড় এফওবি, সিএম ও ভ্যালূ এ্যডিশন কত সেটা তুলনা করেন।

৬.থিঙ্কট্যাঙ্কদের ভন্ডামীর আরেকটা দিক বলি? এরা শুধু গার্মেন্টসের ন্যুনতম মজুরী নিয়ে কথা বলে। দেশে কি শুধু গার্মেন্টসই একমাত্র শিল্প্ বা শুধু এখানেই কি কম বেতন দেয়া হয়? বাকি শিল্পে কি কাড়ি কাড়ি টাকা দেয়া হয় শ্রমিককে? যদি তাই হয় তবে গার্মেন্টসের ৫০ লক্ষ শ্রমিকের বিপরীতে বাকি হাজারো শিল্পে মোট শ্রমিক কেন কম তার ব্যাখ্যা দিন। আর ওদের ন্যুনতম মজুরী কত?

যে পত্রিকাওলারা এত মায়াকান্না করে তাদের ওয়েজবোর্ড আইন অনুযায়ী নিয়মিত দেয়তো?

আর যুক্তি দেব না।
ভাই, এই সেক্টরটি নিখাঁদ নিজের চেষ্টায় বিগত তিন দশকে বাংলাদেশের প্রায় প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। ওইসব তথাকথিত থিঙ্কট্যাঙ্ক, মানবতা কর্মী, এনজিও, কল্যান ফেডারেশন, আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা, সস্তা চিন্তার গবেষক, ফ্রাস্টেটেড গার্মেন্টস কর্মী-এরা আপনাকে বিশ্লেষনধর্মী সত্যিটা দেয়না। দেয় প্রিজুডিসড তথ্য। নিজের সুবিধা ও ইচ্ছামতো।

আমাকে মালিকদের দালাল ভাববেন না। আমাদের সেক্টরের অনেক সমস্যা আছে। অনেক বঞ্চনা আছে। মজুরী, পাওনা নিয়ে সত্যিই অনেক সমস্যা আছে।

আমি শুধু বলছি, একপেশে তথ্য নিয়ে বিভ্রান্ত না হতে। সর্বোপরি আমাদের যেকোনো মূল্যে সেক্টরটাকে যেমন করেই হোক আগে বাঁচাতে হবে। সে বেঁচে থাকলে কমপ্লায়েন্স, ভাল মজুরী, উন্নত জীবন, দারুন পরিবেশ, ক্যারিয়ার, উন্নয়ন চিন্তা, এনজিও আন্দোলন, মানবতা চর্চা-সব হবে।

সেক্টর যদি অবিমৃষ্যকারীতার কারণে মরে যায় তবে কাকে নিয়ে দেশ চালাবেন? তখন কমপ্লায়েন্স রক্ষা করে আমিসহ এই ৫০ লক্ষ শ্রমিকের রাস্তার মোড়ে খদ্দের ধরার ব্যবস্থা করতে পারবেন তো ভন্ড মানবতাবাদীরা?

লেখক : মানবসম্পদ পেশাজীবি

 

Write a comment

এই বিভাগের আরও খবর

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Email this to someonePrint this page

Like us on Facebook