ঢাকা মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭


আইনী-বিশ্লেষণ: কর্পোরেট বাণিজ্য ও নাগরিকের মৌলিক অধিকার

ড. উত্তম কুমার দাস : সাম্প্রতিক সময়ে  দু’টি টেলি-কারিগরি সহায়তা প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মীর চাকরীচ্যুতির ঘটনা সবার দৃষ্টি কেড়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান (যাদের একটি এক টেলিফোন অপারেটরকে আইটি সহায়তা দিতো) তার প্রায় সাড়ে পাঁচ শ’ কর্মীকে একসঙ্গে বাদ (আইনের ভাষায় যা Separation) দিয়েছে। আরেক ঘটনায় ৫০ জনের অধিককে।

পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী প্রথম প্রতিষ্ঠান তার কর্মীদের চার মাসের নোটিশ দিয়ে “অপসারণ” বা টার্মিনেশন করেছে; উক্ত নোটিশের মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের নভেম্বর মাসে। দ্বিতীয় ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, অভিযোগমতে কোন প্রকার “সুযোগ-সুবিধা” না দিয়ে তার ৫০-এর বেশী কর্মীকে বিদায় করতে যাচ্ছে; যাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, অনশন প্রভৃতি হয়েছে।

কোন প্রতিষ্ঠান যেমন তার শ্রমিক বা কর্মীকে নিয়োগ করতে পারে, আবার তার ব্যবসার-ধরণ পরিবর্তন, লোকসান বা অন্য কোন কারণে তাদেরকে বাদও দিতে পারে। তবে তা হতে হবে প্রচলিত আইন-কানুন, নীতিমালা প্রভৃতির আলোকে। এর কোনটিতে অস্পষ্টতা  বা ঘাটতি থাকলে প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আদালতের রায়, প্রচলিত প্রথা, এমনকি নীতি- নৈতিকতা মানার বিষয়ও আসতে পারে।

নিয়োগকারী সাধারণতঃ যে যে ভাবে শ্রমিক বা কর্মীর চাকরীর অবসান করতে পারেন তা হল- লে-অফ, ছাঁটাই, বরখাস্ত, অপসারণ প্রভৃতি। তবে কখন কোনটি করা যাবে তা আইন নির্ধারিত এবং বিভিন্ন সময়ে এসব বিষয়ে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয়েছে।

যেমন কোন প্রতিষ্ঠান তার ব্যবসা গুটিয়ে নিলে বা বন্ধ করলে তার শ্রমিক বা কর্মীকে ছাঁটাই করতে পারবে না,  তখন কোন অন্য পথ দেখতে হবে বলে আদালতের রায়ে সিদ্ধান্ত রয়েছে। কারণ যে কারণে ছাঁটাইয়ের পথ এসেছে তার মানে হল প্রয়োজনের অতিরিক্ত লোকবল কমানো; প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসা একেবারে বন্ধ করা নয়। যদিও আমাদের এখানে প্রতিষ্ঠান বন্ধের ক্ষেত্রে ছাঁটাই করা হয়; তবে তা আইনসিদ্ধ নয়।

এবার উক্ত দু’ প্রতিষ্ঠান প্রসঙ্গে আসা যাক। ঐ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বা অংশ বিশেষ বন্ধ করা এবং শ্রমিক- কর্মীদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ ও পাওনাদি নিয়ে মন্তব্য করতে হলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র দেখা দরকার, যেমন কর্মীর নিয়োগপত্র বা চুক্তি। তার অবর্তমানে পত্র-পত্রিকা ও অন্যান্য গণ-মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এই বিশ্লেষণ।

কোন বিদেশী প্রতিষ্ঠান যখন এদেশে তার ব্যবসা করতে আসে তখন তাকে প্রচলিত কোম্পানী আইন বা অন্য কোন আইনে নিবন্ধিত হতে হয়। তখন তার গঠনতন্ত্র থেকে শুরু করে সব কিছুর কপি জমা দিতে হয়। এদেশে নিবন্ধিত হলে (বা কাজ করলে) বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশীয় প্রচলিত আইন প্রযোজ্য হবে। যেমন- শ্রমিক ও কর্মী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মানব সম্পদ নীতিমালা থাকলেও তাকে আইন ও বিধির আলোকে পরিবর্তিত হতে হবে।

শ্রমিক-কর্মী নিয়োগ সম্পর্কে আরেকটি বিষয় আসবে তাঁরা স্থায়ী না চুক্তি ভিত্তিক। আমাদের এখানে একটি ভুল প্রবণতা রয়েছে- স্থায়ী পদে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মানব সম্পদ ব্যবহারজীবী এবং তাঁদের আইনজীবীরা ভুল করেন। স্থায়ী পদের জন্য কখনও চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ হতে পারেনা; হলে তা বে-আইনী হবে। হলে আইনে তার প্রতিকারও রয়েছে। চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ হতে পারে- কোন নির্দিষ্ট কাজ (Outcome) এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। একজন একই পদে আট-দশ বছর কাজ করলে তা চুক্তিভিত্তিক হয় কি করে? এটা পুরোপুরি বে-আইনী।

প্রশ্ন আসবে এই বিষয় আইন মানা হচ্ছে কি না তা কে দেখবে? প্রথম দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। এর পর আসে বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের দায়। আমাদের এখানে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কাজ চাকরীর শর্তাবলী আইনানুগভাবে পালিত হচ্ছে কি না তা দেখা। এই ক্ষেত্রে তারা প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান বা পরীক্ষণ করবেন (ধারা ৩১৯)। ক্ষতিগ্রস্থ বা ভুক্তভোগী ব্যক্তিও অভিযোগ করতে পারেন। আইন মানা না হলে অধিদপ্তর বাদি হয়ে নিয়োগকারীর বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করতে পারবে।

এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় হবে শ্রমিক বা কর্মীর ভবিষ্যতে প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ এবং সুযোগ সুবিধার দায় এড়ানোর জন্য কথিত “চুক্তি-ভিত্তিক” নিয়োগের সুযোগ নেওয়া হচ্ছে কি না।

দায়-দায়িত্ব এড়ানোর এহেন কৌশল-ভিত্তিক চাকরী-সংক্রান্ত চুক্তিকে (Employment Contract) ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট “বিবেক-বর্জিত” বলে আখ্যা দিয়েছে। এহেন চুক্তি বাতিলযোগ্য এবং মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। অর্থাৎ এহেন চাকরীসংক্রান্ত “চুক্তিপত্র” নিয়ে কেউ আদালতের দারস্থ হলে আদালত তা বাতিল করে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী চাকরী নিয়মিত করার নির্দেশ দিবেন।

কর্মসংস্থান ও জীবন ধারনের অধিকার

বেঁচে থাকার অধিকার (Right to life)  নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য মৌলিক অধিকার। পেশা বা বৃত্তি গ্রহণও একটি মৌলিক অধিকার। এর মানে হ’ল এহেন অধিকার লংঘন হলে আদালতে (এই ক্ষেত্রে মাননীয় হাই কোর্ট বিভাগ) প্রতিকার চাওয়া যাবে।

জীবন তথা বেঁচে থাকার অধিকারের ক্ষেত্র প্রসারিত করে ভারতীয় সুপ্রীম কোর্ট বলেছেন, জীবন ধারনের (Right to livelihood) অধিকার বেঁচে থাকার (Right to life) অধিকার প্রসুত। বেঁচে থাকার অবলম্বন (Right to livelihood) ছাড়া কেউ বাঁচতে পারেনা। তাই কাউকে তাঁর জীবন ধারনের অধিকার (Right to livelihood) থেকে বঞ্চিত করা হলে প্রকারান্তরে তা তার জীবন থেকে (Right to life) বঞ্চিত করার সামিল। কোর্ট আরও বলেছেন, কাউকে তার জীবন ধারণ (তথা কর্মসংস্থান) থেকে বঞ্চিত করতে হলে তা ন্যায্যতা, সঠিক এবং কারণসঙ্গতভাবে (Fair, just and reasonable) করতে হবে।  [Olga Tellis v. Bombay Municipal Corporation, AIR 1986 SC 1980]. 

এইক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের কিছু রায়ও প্রণিধানযোগ্য। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিত বনাম সরকার (ডিএলআর, ৫৩, ২০০১) মামলায় উচ্চ আদালত বলেছেন, জীবন ধারণ (Livelihood) থেকে বঞ্চিত করা বেঁচে থাকার অধিকার (Right to life) থেকে বঞ্চিত করার নামান্তর, যা অসাংবিধানিক ও বে-আইনী।   

আমাদের আদালত তার আরেক রায়ে বলেছেন, অর্থনীতির প্রয়োজনের সংগে সংগতি রেখে জনস্বার্থে এই সংক্রান্ত নীতি ও সিদ্ধান্ত প্রণয়নের বিষয়ে আদালত মাথা ঘামাবে না; তবে তা যদি সাংবিধানিক ও আইন-প্রদত্ত যে সীমা তা ছাড়িয়ে যায় তখন আদালত তা দেখবে। [Bangladesh Agricultural Development Corporation and Others vs. Md. Abdur Rashid and Others, 2014, 43 CLC (AD).]  

আরেক মামলায় [Mohammad Mahbubur Rahman vs. Bangladesh, Writ Petition No. 6516/2013, Honourable High Court Division, Judgement on 15 June 2014] আদালত মন্তব্য করেছেন, সরকারকে এমনটি করতে দেওয়া যাবেনা যাতে করে কর্পোরেশনের ছদ্দাবরণে তাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সংবিধান প্রদত্ত নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে দলিত, মথিত ও বিঘ্নিত করতে পারে (But by no consideration government can be allowed to use corporate façade as a devise to impair, emasculate or frustrate fundamental rights of citizens guaranteed by the Constitution.)

এই আলোচনা থেকে আশা করি বুঝতে পারছেন- কার কি করণীয়!

দ্রষ্টব্য: এই লেখা একটি আইনী- বিশ্লেষণ, কোন আইনী পরামর্শ নয়; এবং শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে তৈরি। আপনার সমস্যার জন্য সংশ্লিষ্ট আইন দেখুন এবং এই বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর সংগে পরামর্শ করুন।

লেখক : ড. উত্তম কুমার দাস, এলএল.এম. (যুক্তরাষ্ট্র), পিএইচ.ডি. (আইন), এডভোকেট, সুপ্রীম কোর্ট অব বাংলাদেশ, ই-মেইলঃ ukdas1971@gmail.com, ফোনঃ ০১৭৫৬ ৮৬৬৮১০।

 

(মতামত লেখকের নিজস্ব, এর সঙ্গে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক সংশ্লিষ্টতার কোন সম্পর্ক নেই)।

 

   

 

Write a comment

এই বিভাগের আরও খবর

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Email this to someonePrint this page

Like us on Facebook