ঢাকা মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭


আইনী বিশ্লেষণ: শ্রম আইনে গ্র্যাচুইটি- কি এবং কার প্রাপ্য?

ড. উত্তম কুমার দাস : শ্রম আইনে গ্র্যাচুইটি- কি এবং কার প্রাপ্য?- এই বিষয় নিয়ে লেখার তাগিদ একটি সমস্যা থেকে। আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক (নাম প্রকাশ করা হলো না) তৈরি পোশাক খাতে নিয়োজিত একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চার বছর সাত মাস কাজ করে সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। তাঁর নিয়োগপত্রে অন্যান্য বিষয়ের সংগে গ্র্যাচুইটির কথা বলা আছে। কিন্তু উক্ত প্রতিষ্ঠান এখন তা দিতে চাচ্ছে না বা গড়িমসি করছে।

আসুন এর সমাধান খোঁজার আগে দেখা যাক গ্র্যাচুইটি কি এবং কে, কখন তা পাবেন।

গ্র্যাচুইটি এক ধরণের আর্থিক সুবিধা, যা নিয়োগকারী তাঁর নিয়োজিত কর্মী বা শ্রমিককে দেন। এই নিয়োগকারীর পক্ষ থেকে এক ধরণের বদান্যতা (Gratuitous), যার বদলে কিছু প্রত্যাশিত নয়।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ গ্র্যাচুইটি প্রবর্তন করছে। আইনের ২(১০) ধারায় বলা হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠান বা কারখানায় কর্মরত কারও গ্র্যাচুইটি পাওয়ার যোগ্যতা হল এক বছর চাকরী। অর্থাৎ এক বছর চাকরী হলেই তা প্রাপ্য। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে গ্র্যাচুইটি চালু করতে বা থাকতে হবে।

এইক্ষেত্রে প্রতি বছরের জন্য প্রাপ্য গ্র্যাচুইটি হবে ৩০ দিনের মজুরীর সম-পরিমাণ অর্থ। আর তা হিসাব হবে সর্বশেষ প্রাপ্ত মজুরী হিসেবে। আর কারও চাকরী ১০ বছর পূর্ণ হলে প্রাপ্য হবে প্রতি পূর্ণ বছরের বিপরীতে ৪৫ দিন হারে মজুরীর সম-পরিমাণ অর্থ। উভয়ক্ষেত্রে গ্র্যাচুইটির হিসাব হবে- সর্বশেষ প্রাপ্ত মাসিক মূল মজুরী এবং মহার্ঘ ভাতার যোগফল।

আর হিসাবে প্রথম এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর ছয় মাসের বেশী হলেই তা এক বছর বলে ধরতে হবে। আর এক বছর ও ছয় মাসের হিসাব হবে- পূর্ববর্তী ১২ মাসে যথাক্রমে ২৪০ দিন এবং ১২০ দিন (শ্রম আইন, ধারা ১৪)।

এবার ঐ ভদ্রলোকের কথায় আসা যাক। তাঁর নিয়োগপত্রে তাঁর প্রাপ্য মজুরী, সুযোগ-সুবিধার সংগে বলা আছে যে তিনি গ্র্যাচুইটি পাবেন এবং তা বাংলাদেশে প্রযোজ্য শ্রম আইন অনুসারে। তা হলে সমস্যা কোথায়?

তিনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন তার প্রধান কার্যালয় একটি পাশের দেশে। ঐ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মানব সম্পদ নীতিমালায় (Service Rule) বলা হয়েছে কোন কর্মী বা শ্রমিক গ্র্যাচুইটি পাওয়ার যোগ্যতা হ’ল- তাঁর চাকরীর মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্ণ হতে হবে।
এই ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ঐ প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা এবং বাংলাদেশ শ্রম আইনের বিধানের মধ্যে সংঘর্ষ রয়েছে। তো কি হবে এখন?
এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শ্রম আইনের বিধান প্রাধান্য পাবে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে- গ্র্যাচুইটি পাওয়ার যোগ্যতা (যদি প্রতিষ্ঠানে তা থাকে বা চালু হয়) হ’ল- পূর্ণ এক বছর চাকরী করা। এই ক্ষেত্রে উক্ত প্রতিষ্ঠান দৃশ্যত (কিছু ক্ষেত্রে) শ্রম আইনের বিধান লঙ্ঘন করেছে।

শ্রম আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও তৎসংক্রান্ত আনুসাঙ্গিক অন্যান্য বিষয়াদি শ্রম আইনের দ্বিতীয় অধ্যায় অনুযায়ী পরিচালিত হবে। এছাড়া কোন প্রতিষ্ঠান চাইলে নিজস্ব চাকরী-সংক্রান্ত বিধি (Service Rule) করতে পারবে; তবে ঐ বিধির (Service Rule) কোন বিধান শ্রম আইনে যা প্রযোজ্য তার চেয়ে কোন অংশে কম হতে পারবে না। অর্থাৎ শ্রম আইনের যা বলা হয়েছে তা নুন্যতম। কোন প্রতিষ্ঠান তার চেয়ে বেশী দিতে পারবে।

বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫ (Bangladesh Labour Rules, 2015) তে (৫ নং বিধিতে) বলা হয়েছে, যে সকল প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব চাকরী বিধি (Service Rules) প্রচলিত রয়েছে সে সব প্রতিষ্ঠানকে এই শ্রম বিধিমালা জারি হওয়ার তিন মাসের মধ্যে উহা (Service Rule) শ্রম আইন এবং এই বিধিমালার (Rules) সংগে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে যথাযথ অনুমোদন নিতে হবে। এই ক্ষেত্রে অনুমোদন দিবে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। শ্রম বিধিমালা জারী হয় ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫।

আর এহেন লঙ্ঘন হলে সংশ্লিষ্ট মালিক বা নিয়োগকারীর বিরুদ্ধে শ্রম আইনের আওতায় তার প্রতিকার ও শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে (শ্রম আইন, ধারা ৩০৭)।

আমাদের সমস্যাক্রান্ত ভদ্রলোকের ক্ষেত্রে তাঁর চাকরীর মেয়াদ পাঁচ বছরের কম হওয়ায় তিনি বছর হিসেবে যে ক্ষতিপূরণ তা পাবেন না (শ্রম আইন, ধারা ২৭)। তবে চাকরী শর্তে গ্র্যাচুইটি উল্লেখ থাকায় তা পাবেন এবং প্রযোজ্য অন্যান্য সুবিধাও (Benefits) পাবেন।

উচ্চ আদালতের রায়ে সিদ্ধান্ত রয়েছে যে, স্বেচ্ছায় পদত্যাগের কারণে গ্র্যাচুইটি থেকে বঞ্চিত করা যাবেনা। চাকরীর নিয়োগের শর্তে থাকায় তা আইনী অধিকারে (Rightful claim) পরিণত হয়েছে; এই ক্ষেত্রে কোন প্রক্রিয়াগত ত্রুটি- যেমন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চাকরী বিধিতে পাঁচ পূর্ণ করার শর্ত থাকা- অগ্রাহ্য হবে। [Mineral Area Development Authority vs. State of Bihar, (1998) 2 LLJ 54] । শ্রম আইনের বিধান (এক বছর) অগ্রগণ্য হবে । আর কোন অধিকার একবার দেওয়া হলে তা থেকে বঞ্চিত করা যাবেনা। [Garment Cleaning Works vs. Workmen, AIR 1962 SC 673] । আরেকটি বিষয়- ভদ্রলোক কোন ধরণের প্রশাসনিক, তদারকি কিংবা ব্যবস্থাপনামূলক কাজে নিয়োজিত ছিলেন না; তিনি যে কাজ করতেন তা কারিগরি ধরণের কাজ। তাই একজন “শ্রমিক” হিসেবে শ্রম আইনের পুরোপুরি সুরক্ষা পাবেন [শ্রম আইন, ধারা ২(৬৫)]।

করনীয়:
শ্রম আইনের ৩০ ধারা অনুসারে তাঁর পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়ার ৩০ কর্ম দিবসের মধ্যে প্রাপ্য সকল পাওনা পরিশোধ করতে হবে। এই দায়িত্ব নিয়োগকারী অথবা তাঁর পক্ষে যিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত তাঁর। পদত্যাগকারীকে তাঁর চাকরী সংক্রান্ত সনদপত্রও দিতে হবে (শ্রম আইন, ধারা ৩০ এবং ৩১)।

এই ক্ষেত্রে পাওনা অর্থ আদায়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি শ্রম আইনের ৩৩ ধারার বিধান অনুযায়ী তাঁর নিয়োগকারী বরাবরে অনুযোগপত্র দিতে পারেন। তাঁর সংক্ষুব্ধ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তা করতে হবে (ব্যতিক্রম সাপেক্ষে)। এমন অনুযোগ পাওয়ার পর নিয়োগকারীকে ৩০ দিনের মধ্যে তা সুরাহা করতে হবে। তাতে ব্যর্থ হলে কিংবা গৃহীত সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ৩০ দিনের মধ্যে শ্রম আদালতে মামলা করতে পারেন।

তবে বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫ (বিধি ১১৩) আরও সহজ পথ দিয়েছে। কোন শ্রমিকের প্রাপ্য মজুরী ও অন্যান্য পাওনাদি বে-আইনীভাবে কর্তন করা হলে (বা না দিলে)) সংশ্লিষ্ট শ্রমিক বা তাঁর পক্ষে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কেউ তা লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট মালিককে জানাতে পারবেন। এইক্ষেত্রে মালিককে ১০ দিনের মধ্যে দাবী নিষ্পত্তি করতে হবে। তাতে ঐ মালিক ব্যর্থ হলে দাবীকারী কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক অথবা তাঁর পক্ষে ক্ষমতা প্রাপ্ত পরিদর্শককে তা লিখিতভাবে জানাতে পারবেন। এই ধাপে সুরাহার জন্য বরাদ্দ সময় পদক্ষেপ গ্রহণসহ ৫০ দিন (২০ দিন পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য + ৩০ দিন মীমাংসার জন্য)। এইক্ষেত্রে মহাপরিদর্শক বা তাঁর পক্ষে ক্ষমতাপ্রাপ্ত পরিদর্শক শুনানী করে তার ভিত্তিতে লিখিত সিদ্ধান্ত দিবেন। তা সর্ব সম্মত হলে পক্ষদের জন্য তা বাধ্যতামূলক হবে। আর পরিদর্শক কোন সিদ্ধান্ত এককভাবে দিলে সংক্ষুব্ধ পক্ষ সিদ্ধান্ত দেওয়ার তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে শ্রম আদালতে মামলা করতে যেতে পারবেন।

এছাড়া শ্রম আইনেরই ১৩২ ধারার বিধান মতে, বঞ্চিত ব্যক্তি তাঁর প্রাপ্য বকেয়া মজুরী ও অন্যান্য পাওনাদি (গ্র্যাচুইটিসহ) আদায়ের জন্য শ্রম আদালতে সরাসরি মামলা করতে পারেন। তবে এইক্ষেত্রে ঐ অর্থ প্রদেয় হওয়ার (বঞ্চিত হওয়ার) দিন থেকে ১২ মাসের মধ্যে মামলা করতে হবে।

তবে আলোচ্য ভদ্রলোকের জন্য শেষ পরামর্শ হ’ল- শ্রম আইন ও তার প্রক্রিয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞ কোন আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা শ্রেয় হবে।

দ্রষ্টব্য: এই লেখা একটি আইনী- বিশ্লেষণ, কোন আইনী পরামর্শ নয়; এবং শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে তৈরি। আপনার সমস্যার জন্য সংশ্লিষ্ট আইন দেখুন এবং এই বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর সংগে পরামর্শ করুন।

লেখক : এডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ


এলএল.এম. (যুক্তরাষ্ট্র), পিএইচ.ডি. (আইন)
এডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ
ই-মেইলঃ ukdas1971@gmail.com
www.uttamkdas.simplesite.com


(মতামত লেখকের নিজস্ব, এর সঙ্গে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক সংশ্লিষ্টতার কোন সম্পর্ক নেই)।

 

Write a comment

এই বিভাগের আরও খবর

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Email this to someonePrint this page

Like us on Facebook