ঢাকা মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭


বৈশ্বিক জলবায়ূ পরিবর্তন ও প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

আখলাকুর রহমান : ভূ-প্রকৃতিগত গঠন বৈশিষ্টের দিকে থেকে বাংলাদেশ হিমালয় থেকে সৃষ্ট নদীগুলোর পলল দ্বারা গঠিত ব-দ্বীপ। এক সময় সারা দেশে জালের মতো নদী-নালা, খাল-বিল ছিল কিন্তু উন্নয়ন এবং আন্তমহাদেশীয় রাজনৈতিক কারণে, নদীর গতি পথ বাঁধা প্রাপ্ত হয়েছে এবং নদীর প্রবেশ মূখে বাঁধ বা ড্যাম তৈরী করে নদীর গতি পথ পরিবর্তন সহ নদীকে মেরে ফেলা হয়েছে বহুলাংশে। দিন দিন অধিক জনসংখ্যার খাদ্য আর বাসস্থানের চাহিদা মেটানোর জন্য শিল্পায়নের দিকে মনোযোগ দেয়া হয়েছে, ফলে বৃক্ষ ও পাহাড় কর্তন, নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট ফলে আবাদি জমির ওপর চাপ বাড়ছে এবং অধিক মাত্রায় কমে গিয়েছে বনভূমি এবং সাথে সাথে আবাদি জমিও। মূলত শিল্পায়ন, নগরায়ন, অধিক জনসংখ্যার জন্য খাদ্য উৎপাদন সহ নানান কারণে পরিবেশের মৌলিক পরিবর্তন শুরু হয়েছে ১৯০০ সালের প্রথম দিকে থেকেই। বিশ্বে অতিমাত্রায় কার্বন ও গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর ফলে অতি বৃষ্টি বা খরা দেখা দিয়েছে বাংলাদেশ সহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে।

জাপানের কীয়টো (Kyoto) শহরে ১১ ডিসেম্ভর ১৯৯৭ সালে কীয়টো প্রোটকলটা অনুমোদন করা হয় এবং ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০০৫ সালে তা বাস্তবায়ন শুরু হয়। Kyoto protocol-এ ১৯২টি দেশ স্বাক্ষর করেন এবং ২০১২ সালে কানাডা এই চুক্তি হতে তাদের নাম প্রত্যাহার করে নেয়। কীয়টো চুক্তি হলো কার্বন ও গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে একটি চুক্তি এবং এই চুক্তিটি জাপানের কীয়টো শহরে অনুষ্ঠিত হওয়াতে এই শহরের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে কীয়টো প্রোটকল (Kyoto Protocol).

কীয়টো প্রোটকল (Kyoto protocol) হলো বিশ্বে উষ্ণতা ও কার্বনডাইঅক্সাইড নির্গমন কমানো বা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে একটি চুক্তি, যাতে সকল দেশ কার্বন নির্গমণ নিয়ন্ত্রণ এবং উষ্ণতা কমানোর জন্য একমত হয় এবং চুক্তি মতো কাজ করতে সম্মত হয়।

Group-7(G-7) দেশগুলো হলো কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানী, ইতালী, জাপান, ই্ংল্যান্ড এবং আমেরিকা। International Monetary Fund (IMF) এর হিসাব মতে বিশ্বের মোট সম্পদের ৬৪% যার পরিমাণ $263 ট্রিলিয়ন এবং বিশ্ব জিডিপির ৪৬% প্রতিনিধিত্ব করছে জি-৭ দেশগুলো।

২০১৭ সালে জি-৭ বা শিল্প উন্নত সাতটি দেশের সম্মেলনে আমেরিকা উক্ত চুক্তি অনুসারে উষ্ণতা এবং কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য শিল্প উন্নত দেশ গুলোর দায়িত্ব কৌশল থেকে বের হয়ে যায়। কার্বন এবং গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমনের ফলে পরিবেশ বিপর্যয় এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশী পরিমাণ কার্বন ও গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমন করছে শিল্প উন্নত এই সাতটি দেশ। কিন্তু উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের মতো অনুন্নত কৃষি নির্ভর দেশ। তাই বলা বাহুল্য যে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা বৈশ্বিক জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে বিশ্বে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ সহ উপকূলীয় নিন্ম দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় সবার ওপরে। অথচ তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য বা কার্বন নির্গমনের জন্য এই সকল দেশ মোটেও দায়ী নয়।

১৯০৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ১০০ বছরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ছিল গড়ে ০.৬ থেকে ০.৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং অনুমান করা হচ্ছে ২০২০ সালে এই বৃদ্ধির হারটা হবে ০.৯৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস গড়ে। দেখা যাচ্ছে যে, বিগত ৫০ বছরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার পূর্ববর্তী ৫০ বছরের চেয়ে দ্বিগুণ। এবং আগামী ৫০ বছরে বর্তমানের চেয়ে এই বৃদ্ধির হারটা দ্বিগুণের চেয়ে বেশী হবে। আবার সহজ ভাবে বলা যায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই হারটা ১৯৮০ থেকে উল্লেখযোগ্য ভাবেই বেড়ে চলছে যা কোন ভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না কিংবা শিল্প উন্নত দেশগুলো বাস্তব সম্মত কোন প্রদক্ষেপ গ্রহণ করছে না।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরেুতে জমে থাকে বরফ খন্ড ব্যাপক হারে গলতে শুরু হয়েছে এবং সমুদ্র পৃষ্টে পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সুমদ্র পৃষ্ঠ থেকে যে সকল দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের উচ্চতা কম সেই সকল দেশ ধীরে ধীরে সাগর তলে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সাগর থেকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের উচ্চতা ১.৫ মিটার। শুধু যে সমুদ্র পৃষ্ঠে পানির উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু তা-ই নয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এই ক্ষতিটা ইতি মধ্যে শুরু হয়েছে। অতি বৃষ্টি, খরা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ঘুর্নিঝড়, বজ্রপাত কৃষি নির্ভর এই দেশের নিত্যনৈমত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার কারণে জাতীয় আয়ে কৃষির অবদান কমছে এবং কৃষি নির্ভর মানুষ এবং শ্রমিকদের জীবন সংকটাপন্ন হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের তাপমাত্রা গ্রীষ্মকালে গড়ে ৩৮-৪১ ডিগ্রী এবং শীতে ১৬-২০ ডিগ্রী। হিসাব মতে, বর্তমান শতাব্দীর শেষ নাগাদ তাপমাত্রার গড় বৃদ্ধি হবে ১.৬-১.৯ ডিগ্রী পর্যন্ত এবং গড় তাপমাত্রা যদি ৪৫ ডিগ্রী পর্যন্ত হয় তবে কী হতে পারে আমাদের প্রকৃতিতে তা বিষদ ভাবে ব্যাখা করার প্রয়োজন আছে কী? আবার আগামী ৮০ বছরে বর্ধিত জনসংখ্যার অতিরিক্ত খাদ্য, বাসস্থান, শিল্পায়ন, সামরিক বাহিনীর জন্য প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্রের ব্যবহারসহ মানুষের অন্যান্য সকল চাহিদা মেটানোর জন্য জমিতে কী পরিমান চাপ বাড়বে তা আমরা সহজে অনুমান করতে পারি বিগত শতকের উন্নয়ন, জমি ও সমুদ্রের ব্যবহার দেখেই। আবার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, উন্নত ও যুদ্ধবাজ দেশগুলো দ্বারা ইউরেনিয়াম উৎপাদনের জন্য চুল্লি নির্মাণ, উন্নত দেশগুলো কর্তৃক পরিত্যাক্ত কয়লা বা ফজিল জ্বালানী নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র উন্নয়নশীল দেশগুলো কর্তৃক স্থাপনের কারণেও পরিবেশ বিপন্ন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির মৌলিক কারণ হিসাবেই ধরা হয়।

Kyoto Protocol অনুসারে ইউরোপ ও এশিয়া ভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন কিন্তু এই কার্বন নির্গমন নিয়ন্ত্রণ মাত্রা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য বা এ্রখনোও কাগজ পত্রেই সীমাবদ্ধ। কার্বন নির্গমন ও গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে Kyoto Protocol এ স্বাক্ষরকারী দেশসমূহকে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে শক্ত অবস্থানে গিয়ে একযোগে কাজ করতে হবে, তা না হলে এর সুফল পাওয়া যাবেনা। আবার কানাডা এবং আমেরিকাকে কার্বন ও গ্রীন হাউজ নির্গমন কমানোর বিষয়ে আবারও Kyoto protocol নিয়ে আসাতে হবে কেননা শিল্প উন্নত ৭টি দেশের মধ্যে কানাডা ও আমেরিকা কার্বন ও গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমন করছে অধিক মাত্রায়। সেই কারণে এই গ্যাসগুলো নিয়ন্ত্রণের দায়ভার তাদের ওপর বর্তায় সর্বাগ্রে।

বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ নিয়ে উন্নয়ন কর্মী সহ দাতা সংস্থাগুলোকে আসন্ন জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে যে ধ্বংস বা ক্ষয়ক্ষতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ তা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরাম সহ উন্নত দেশ এবং উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর কাছে তোলে ধরতে হবে এবং বৈশ্বিক জলবায়ূ পরিবর্তনের জন্য ঝুঁকি মোকাবেলা এবং ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং প্রতিরোধের নকশা উদ্ভাবন করতে হবে, সময় হাতে থাকতেই বা মহাসংকট শুরু হওয়ার পূর্বেই।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, জলবায়ূ পরিবর্তন মোকাবেলার জন্য আন্তর্জাতিক ফোরাম বা দাতা গোষ্ঠীগণ যে তহবিল গঠন করেছেন এবং বাংলাদেশকে জলবায়ূ পরিবর্তন মোকাবেলার জন্য যে অনুদান দেওয়া হয়েছে সেই অনুদানের তহবিল আবার ফেরৎ চলে যায় দাতাদের তহবিলে। তাহলে প্রয়োজনীয় অর্থ না পেলে কী ভাবে জলবায়ূ পরিবর্তন মোকাবেলা করা হবে? সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের কর্তব্য হলো, বৈশ্বিক জলবায়ূ পরিবর্তন মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় বিষেজ্ঞ ও দক্ষ জনবল তৈরীতে সহায়তা করা এবং প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করে, বৈশ্বিক জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে আসন্ন ঝুঁকি মোকাবেলা করার জন্য দেশ ও জাতিকে প্রস্তুত করা।

লেখক: পরিবেশবিদ

Write a comment

এই বিভাগের আরও খবর

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Email this to someonePrint this page

Like us on Facebook