ঢাকা মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭


একজন পোশাক শ্রমিক রোমেছা আর তার ঈদভ্রমণ

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল : রোমেছা একজন অপারেটর বাড়ী লালমনিরহাট জেলার মোগলহাট ইউনিয়ন। ঢাকায় আসার প্রায় ৭/৮ বছর হয়ে গেছে। ঢাকায় তার সাথে থাকে স্বামী আর একটি ছেলে সন্তান আর বাড়ীতে রয়েছে বাবা মা আর একটি ছোট ভাই। রোমেছা এলাকায় যখন ছিল তখন তার বিয়ে হয়নি সে আর তার মা মানুষের বাসায় আর ক্ষেত খামারে কাজ করতো। বাবার কাজ করার কোন উপায় ছিলনা কারণকবছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় সে তার দু পা হারায়। হতে পারে গরীব কিন্তু মানসম্মানের ভয়ে ভিক্ষেও করতে পারেনা, আবার সংসারও চলেনা আর সেজন্যই রোমেছা আর তার মা দিন হাজিরায় কাজ করা শুরু করেছিল। ছোট ভাইটা বাউন্ডুলে টাইপের ছেলেপেলের সাথে মিশে একেবারে বখে গিয়েছে ওকে দিয়ে এ জীবনে আর কিছুই হবেনা তা রোমেছা খুব ভাল করে জানে। আর সেতো বাসায় এসে ভাত সামনেই পায় সে কি বুঝবে একটা গ্রাম্য  এলাকায় মেয়ে মানুষের কাজ করে ক টাকাই বা আয় হয়! পুরুষ দিনমজুরদের দিন হাজিরা সবসময় একটু বেশীই থাকে। হুট করে রোমেছার মাকে শ্বাসকষ্ট টা বেশী কষ্ট দিচ্ছিল তাই সে কাজে অনিয়মিত হয়ে পড়েছিল এভাবেই পুরো পরিবারের ভরণপোষণ এর দায়িত্ব একা মেয়ে রোমেছার উপর বর্তায়। আজও বাড়ীতে সকলের পরিস্থিতি তাই আছে কিন্তু রোমেছা এখন ঢাকায় আর তার জীবনে যোগ হয়েছে আরও দুটি মানুষ তার স্বামী আর সন্তান। যখন এলাকায় আয় করে সংসার চালানো তার জন্য দুষ্কর হয়ে গিয়েছিল ঠিক সেই সময় পাশের গ্রামের আলী ভাই তাকে ঢাকায় চাকুরী করার প্রস্তাব দেয় গার্মেন্টস এর হেল্পার হিসাবে বেতন তিন হাজার আর ওভারটাইম সহ ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা হবে, আবার প্রতিবছর বেতন কিছু বাড়বে। কোন দিক চিন্তা না করে আলী ভাইয়ের কথা মত ঢাকায় এসে গার্মেন্টস এ যোগ দিল। অনেক স্বপ্ন মনে কিছু একটা করতে হবে, ভাইটা, বাবা মা যেন ভাল থাকে সেই ব্যবস্থা! শুরু হল কাজ। তবে ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করবে জেনে এলাকার অনেক মহিলা তাকে একটু তিরস্কারও করেছিল বটে। বুঝি গার্মেন্টস শ্রমিকের মানসম্মানও নেই , তারা মানুষের শ্রেণীতেও পড়েনা ! কিন্তু সব কথা উপেক্ষা করে ঢাকায় এসেছিল সে, তাই তার একমাত্র লক্ষ্য ভাল কাজ করে উন্নতি করা। রোমেছা অনেক ভদ্র একটি মেয়ে আর কাজেও অনেক মনযোগী তাই সুপারভাইজার রফিক ভাই চাকুরীর শুরু থেকেই তাকে খুব পছন্দ করতো আর তাই লাইনে যখন কাজ থাকতো না বা রোমেছার কাজ শেষে হলে রফিক ভাই তাকে অপারেটরের কাজ শিখাতো। সে খুব মনোযোগ দিয়ে শিখছিল তাই কাজে যোগ দেয়ার ৬ মাসের মাথায় সে প্লেন মেশিনে ২ টা প্রসেস আর টু নিডেল মেশিনের ১ টা প্রসেস শিখে যায়। সে যে কাজগুলি শিখেছিল সেই কাজগুলি যে অপারেটররা করতো তারা ৩৪৫৫ টাকা মজুরী আর ওভারটাইম সহ তার থেকে প্রায় ১ থেকে ১৫০০ টাকা বেশী আয় করতো। রফিক ভাই রোমেছা বাড়ীর কথা জানতো তাই সে পিএম স্যারকে অনেক অনুরোধ করল যেন তাকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী অপারেটর এর গ্রেডে পদন্নোতি দেয়া হয়। পিএম স্যারও চেষ্টা করলো কিন্তু একই কারখানাতে থেকে হেল্পার থেকে অপারেটর হয়ে অন্যান্য অপারেটরদের সম পরিমান বেতন পাওয়া যে অধিকাংশ কারখানাতেই হয়ে ওঠেনা! আর তাই রফিক ভাই তাকে পাশের কারখানার সুপারভাইজার এর সাথে কথা বলে ৩৬০০ টাকা বেতন ধার্য করে অপারেটরের কাজ দিল, যাওয়ার আগে রফিক ভাই অবশ্য কানে কানে বলেছিল “বোন চিন্তা করিস না, পিএম স্যারের সাথে কথা হয়েছে তিন মাস পরেই অপারেটর হিসাবে তোকে আমাদের কারখানাতে নেয়া হবে”। রফিক ভাই তার কথা রেখেছিল, রোমেছা আরও কাজ শিখে তার পূর্বের কারখানায় যোগ দিল ৩৭৬৩ টাকা বেতনে কিন্তু একটি পরিবর্তন তার জীবনে ইতিমধ্যেই ঘটে যায়। তার জীবনে আরেক অস্তিত্বের যোগ হয় সে হল তার স্বামী পাশের কারখানার সেই সুপারভাইজার আনোয়ার সেও ভাল ছেলে বাড়ী কুড়িগ্রাম। কোন রকম খেয়ে না খেয়ে সব খরচ চালিয়ে রোমেছা দেড় বছরের মাথায় তার ভাইকে এলাকায় একটা ছোট পানের দোকান ধরিয়ে দেয়। সে নিজের খরচ টা নিজে  চালাচ্ছে সেই যা শান্তি। বাড়ী খুব একটা যাওয়া হয়না । বছর দুই ঈদে যা একটু ছুটি পাওয়া এটাই সাধারণত সব কারখানাতেই হয়ে থাকে। উপর থেকে নীচ অবধি যে যত কম ছুটি নিবে সে বসদের আছে ততো ভাল! ঈদের আগে তাদের একটাই চিন্তা কিভাবে বাড়ী যাবে , কার জন্য কি নিবে সাধ্যও তো তেমন নেই ইচ্ছে থাকলেই কি অনেক কিছু করা যায়! তার বেতন অবশ্য এখন ৬৪২০ টাকা আর ওভারটাইম সহ মাসে ৮/৯ হাজার টাকা পায় কিন্তু তাতে কি, তখন আর এখন জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে তো বাড়ছেই আবার বাড়ীর মালিক কখনো কখনো ছয়মাস না যেতেই বাড়ীর ভাড়া বাড়ায় । কেন যে ওরা এমন করে কেউ দেখারও নেই!

ঈদে বাড়ী যাওয়ার টেনশন! পাশের লাইনের লাইন চীফ লিটন বসের বাড়ী কুড়িগ্রাম ফুলবাড়ী সে প্রতি বছর রিজার্ভ বাস ভাড়া করার ব্যবস্থা করে , আশেপাশে এলাকার যারা গার্মেন্টসে কাজ করে সবাই একসাথে এক বাসে বাড়ীর উদ্দ্যেশে যায়। ভালই লাগে তাদের একলা লাগেনা আবার পরিচিতজনরা একসাথে গেলে মানসিক একটা শান্তি থাকে। কিন্তু বাসগুলো দেখতে একদম মুড়ির টিনের মত,  ঐযে ঢাকা শহরের লোকাল বাস যেগুলো রাস্তায় চলে সেগুলোই তো। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ঐ আঁটসাঁট সিটে বসে এতদূর যাওয়া কি কম ধকল! তবুও ওটাই ভরসা কারণ ঈদের সময় বাসের ভাড়া যে হারে বাড়ে তাতে যেতে আসতে বোনাসের একটা বড় অংশ চলে যায়, আবার যাত্রার দিন রিক্সা/ সিএনজি ভাড়া করে বাস কাউন্টারে যাওয়া এটাওতো খরচ, এদিকে যত কম খরচ করে পরিবারের জন্য একটা উপহার বেশী নিতে পারলে সকল কষ্ট নিমেষেই দূর!

এবারও লিটন বস নিজ উদ্যোগে একটা বাস ভাড়া করেছে, সুবিধা হল বাসটি একবারে কারখানার পাশে এসে থামবে, তার স্বামী পাশের কারখানায় কাজ করে, ছেলে চাইল্ড কেয়ারে, ব্যাগট্যাগ সব নিয়েই তাই আজ সে কারখানায় এসেছে। অবশ্য কারখানায় ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে দেবেনা তাই পাশের পরিচিত দোকানে ব্যাগটা রেখেছে সে। ব্যাগে তার বাবা মা আর ভায়ের জন্য রয়েছে নতুন কাপড়। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে রোমেছার নতুন কাপড় কোথায়? আপনার জ্ঞাতার্থে জানাই  কারখানায় রোমেছার মত অন্যান্য অপারেটর হেল্পার কিংবা লাইনচীফ সুপারভাইজারদের কাছে যেদিন কারখানা ছুটি হয় সেই দিনটাই তাদের কাছে আসল ঈদ। সকলে নিজেদের নতুন জামাটা পড়ে আসে, উৎসাহী ভাইয়েরা মিউজিক সিস্টেম ভাড়া করে এনে সকাল থেকেই তা বাজানো শুরু করে। যে যার নতুন জামাটি পড়ে নিজের পছন্দমত সেজেগুজে কারখানায় আসে। কি মজা! কি ভাল লাগে জানেন! এর কারণ টা জানেন? এই যে একসাথে যারা কাজ করছে এই যে কর্মক্ষেত্র এটাকে তারা পরিবারের মতই মনে করে। আবার এতদিন পর বাড়ী যাওয়ার আনন্দ, আর বাড়ীতেই বা কাকে নতুন জামাটি দেখাবে? কে আছে ? যারা আছে তারা অনেকে তো এখনো গার্মেন্টস শ্রমিকদের একটু তির্যক চোখে দেখে! অথচ দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হল এই গার্মেন্টস শিল্প। তাতে কি রোমেছা বা অন্য যারা এখানে কাজ করে তাদের এসব কথায় কিছু যায় আসেনা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে একজন শ্রমিকের মত পরিশ্রম করে রোজগার করুক না, কজন পারেন দেখি। সে আর তার স্বামী মিলে বোনাস পেয়েছে সর্বসাকুল্যে ৮,৫০০ টাকার মত তার থেকে তার স্বামীর বোনাসটা কয়েক টাকা কম কারণ স্টাফদের জন্য ৬০%- ৪০% বোনাস, এর অর্থ এক ঈদে বেসিকের ৬০% আরেক ঈদে ৪০% ।এই সূত্র কোথা থেকে কারা আবিষ্কার করলো সেটা রোমেছার মাথায় আসেনা। সেই ৮৫০০ টাকার মধ্যে ২৪০০ টাকা যাবে বাস ভাড়া, পথে অন্যান্য খরচ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। বাবা মা ভাইয়ের কাপড় নিয়েছে ২৫০০ টাকা (কাপড়ের দামও যা বেড়েছে, হাত দিলেই মনে হয় হাত পুড়ে যাবে), বাবুর জন্য শার্ট প্যান্ট আর ঘড়ি ১৩০০ টাকা (নিজের বাচ্চাকে সবাই একটু ভাল কিছু দেয় এটাই স্বাভাবিক),রোমেছা জামা নিয়েছে ১২০০ টাকা সর্বমোট খরচ হল ৭৮০০! ওমা হাতে থাকল কি ? মাত্র ৮০০ টাকা!  এ দিয়ে বাড়ী গিয়ে ঈদের বাজার সদাই কি হবে? ভাগ্যিস অগ্রিম কিছু টাকা পেয়েছে, কিন্তু এতেও তো সমস্যা। পরের মাসে অনেক ধকল পোহাতে হবে যে! কি আর করা দুইটাই তো পর্ব কোনরকম কম খেয়ে না খেয়ে চলতে হবে আরকি। ভাবছেন রোমেছার স্বামীর নতুন জামা কোথায়? আরে এরই নাম পরিবার! তারা ভাগ করে নিয়েছে কোন ঈদে বাপের বাড়ী কোন ঈদে শ্বশুর বাড়ী। জামা কাপড়ও সেভাবে ভাগ করে কেনা হয়। এবার পালা রোমেছার বাড়ী আর পরের ঈদে জামাইয়ের বাড়ী! কত সুন্দর চুক্তি দেখেছেন? ইস তিস্তার পানিটাও যদি এভাবে ভাগাভাগি করে নেয়া যেত!

রোমেছা আজকে বাড়ী যাবে কত আনন্দ মনে কিন্তু মনে সংশয় লেগেই আছে, বাবুটার কদিন আগে চিকুনগুনিয়া হয়েছে শরীরটা এখনো অতটা সুস্থ নয় এবারও যদি গত বারের মত বাড়ী যেতে ২৫ ঘণ্টা বা তার বেশী লাগে তাহলে কি হবে? আবার রোজা রেখে এত কষ্ট সহ্য করাও অনেক দুষ্কর! অনেক বোনেরা তো সহ্য করতে না পেরে বমিতে বাস ভাসিয়ে দেয় আর এর ফলে অনেক সময় রোমেছাও আর সহ্য করতে পারেনা, তাই তারও বের হয়ে আসে! কি যে জ্যাম, কেন জ্যাম ভেবেই কূলকিনারা পায়না। গতবার বাইপাইল থেকে চন্দ্রা পার হতেই  ৫ ঘণ্টা লেগেছিল। সাইদুর স্যার নামে রোমেছাদের পিএম স্যার এর গল্প ঈদ এলেই মনে পড়ে তার। স্যার একবার ঈদের সময় তার বাড়ী ঝিনাইদহ যাবার জন্য সাভার থেকে গাড়ীতে চড়ে রাত ১০ টায়, অতঃপর ঘুমিয়ে পড়ে, ভেবেছিল ঘুম থেকে ওঠেই দেখবে বাড়ী! কিসের বাড়ী কিসের কি উনি সকালে যখন ঘুম থেকে উঠলেন দেখলেন আশুলিয়া থানার পাশে বাস ঠায় দাঁড়িয়ে, হাসিও পায় কান্নাও পায়! মাত্র ক কিলো রাস্তা আসতে লেগেছিল ৭/৮ ঘণ্টা! মোটে ৭ দিন ছুটি তার ২/৩ দিনই যদি রাস্তায় চলে যায় কিসের ঈদ কিসের আনন্দ! তবুও রোমেছারা বাড়ী যায় পরিবারের টানে নাড়ীর টানে। কত সরকার আসে যায় বলে জ্যাম কমাবো , কোন সমস্যা হবেনা! টিভিতেও দেখা যায় সব ঠিকঠাক আর তখন মনে একটা বলও আসে , আর যাত্রা শুরু করে যখন দেখা যায় যেইকে সেই মনটা দুঃখ ভারক্রান্ত হয়। রোমেছা প্রায়ই ভাবে আচ্ছা আমরা যে এতো দামী দামী কাপড় বানাচ্ছি, আমাদের দাম নাইবা দিল সবাই কিন্তু মানুষ ভাবা যায় তো নাকি? একটু দয়া করে যদি ঈদের সময় ধকল টা কমানো যায়, তাহলেতো রোমেছার মত শ্রমজীবীরা একটু সস্তি পায়, বাড়ীতে গিয়ে একটু বেশী সময় কাটাতে পারে। বিশ্রামের কথা নয় বাদ দিলাম। 

শুনলাম রংপুরে ১৭ জন শ্রমিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে, রোমেছার বাড়ী ও রংপুরের উপর দিয়ে যেতে হয়, আচ্ছা রোমেছা সুস্থ আছে তো! আপনারা কোন খবর জানেন?

লেখক : মানবসম্পদ প্রশিক্ষক

Write a comment

এই বিভাগের আরও খবর

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Email this to someonePrint this page

Like us on Facebook