ঢাকা রবিবার, আগস্ট ১৪, ২০২২



৬ মাসে কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় নিহত ৩৩৩ জন শ্রমিক

ডেস্ক রিপোর্ট: সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের ওপর ভিত্তি করে বেসরকারি সংস্থা সেইফটি এন্ড রাইটস সোসাইটি (এসআরএস) কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় বিগত ৬ মাসে (১ জানুয়ারী – ৩০ জুন, ২০২২) সারাদেশে ২৪১টি কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় ৩৩৩ জন (সীতাকুন্ড দুর্ঘটনায় নিহত ৪৯ জনসহ) শ্রমিক নিহত হয়েছে। ২০২১ সালে একই সময়ে সারাদেশে ২২০টি কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় ৩০৬ জন শ্রমিক নিহত হয়েছিল।

মোট ২৬টি দৈনিক সংবাদপত্র (১৫টি জাতীয় এবং ১১টি স্থানীয়) পর্যবেক্ষণ করে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। যেসকল শ্রমিক কর্মক্ষেত্রের বাহিরে অথবা কর্মক্ষেত্র থেকে আসা-যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় অথবা অন্য কোন কারণে মারা গিয়েছেন তাদের এই জরিপের মধ্যে অর্ন্তভুক্ত করা হয়নি।

জরিপে প্রাপ্ত কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক নিহত হয়েছে পরিবহন খাতে যাদের সংখ্যা মোট ১৩৮ জন, এর পরেই রয়েছে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে (যেমন- ওয়ার্কশপ, গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি) ১০০ জন, নির্মাণ খাতে নিহত হয়েছে ৪৮ জন, কল-কারখানা ও অন্যান্য উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানে এই সংখ্যা ২৬ জন এবং কৃষি খাতে ২১ জন।

মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫৩ জন, আগুনে পুড়ে ৫৭ জন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ২৫ জন; ছাদ, শক্ত বা ভারী কোন বস্তুর দ্বারা আঘাত বা তার নিচে চাপা পড়ে ২৩ জন; মাঁচা বা ওপর থেকে পড়ে মারা গেছে ১৯ জন; বজ্রপাতে ১৫ জন; বয়লার বিস্ফোরণে ১৫ জন; রাসায়নিক দ্রব্য বা সেপটিক ট্যাঙ্ক বা পানির ট্যাঙ্কের বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ জন; পাহাড় বা মাটি, ব্রিজ, ভবন বা ছাদ, দেয়াল ধসে ৯ জন। এছাড়া পানিতে ডুবে ৮ জন শ্রমিক নিহত হয়।

জরিপ তথ্য প্রকাশ কালে এসআরএস এর নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা বলেন কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় মৃত্যু কাম্য নয়। সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু চালক ও হেলপার মৃত্যুর ঘটনাগুলো আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি। তিনি বলেন পরিবহন খাতকে নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরো নজরদারী বাড়াতে হবে। তা না হলে দুর্ঘটনা বাড়তেই থাকবে। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিয়ে মালিকদের অবহেলা এবং সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর যথাযথ পরিদর্শনের ঘাটতি কর্মদুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সীতাকুন্ড দুর্ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা আমরা দেখতে পেয়েছি। এইসব দুর্ঘটনার কারন চিহ্নিত করে তা কিভাবে কমিয়ে আনা যায় সেই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শীঘ্রই ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশা রাখি। টেকসই উন্নয়নের জন্য শোভন কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব এবং এজন্য শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করতে হবে।

জরিপের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগে বাধা, বেপোরোয়া যান চলাচল ও অদক্ষ চালক ইত্যাদি হল পরিবহন দুর্ঘটনার মূল কারণ। সাম্প্রতিকালে অগ্নিদুর্ঘটনায় নিহতের পরিমান বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে এসআরএস জানিয়েছে কারখানায় অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা না থাকা, ক্যামিকেল সংরক্ষণে অদক্ষতা ও অবহেলা, কারখানায় ভবনে জরুরী বর্হিগমন পথ না থাকা, কারখানা নির্মাণে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে অনুমতি না নেওয়া, সেইফটি বিষয়ে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ না দেওয়া। কোনরকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিয়েই বৈদ্যুতিক লাইন সংযোগ দেয়া এবং পাশাপাশি ভেজা হাতে মটর চালু করা, মাথার ওপরে যাওয়া বিদ্যুতের লাইনের নিচে কাজ করা, ভবনের পাশে দিয়ে বয়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক তারের পাশ দিয়ে লোহার রড উঠানোকে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। তাছাড়া ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার না করার কারণেও কিছু দুর্ঘটনা ঘটছে।

এসআরএস বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণ ও আলোচনার মাধ্যমে কর্মদুর্ঘটনা বন্ধে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করে আসছে। কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এই প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। একমাত্র সকলের যৌথ প্রচেষ্টাই পারে কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনা থেকে শ্রমিকের জীবন বাঁচাতে। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম প্রদান, সেইফটি বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব মালিক সমাজের। মালিক কর্তৃক শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে কিনা তা পরিদর্শন করার দায়িত্ব সরকারি প্রতিষ্ঠানের। সরকার ও মালিক উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কর্মদুর্ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব হবে।

Comments


আর্কাইভ