ঢাকা সোমবার, আগস্ট ২, ২০২১



দুর্যোগকালে শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং শ্রম আইনের বিধি-বিধান সংশোধনের দাবি

ডেস্ক রিপোর্ট: রানা প্লাজা ধ্বস থেকে শিক্ষা নিয়ে দূর্যোগকালীন সময়ের কথা মাথায় রেখে শ্রম আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ। ২৪ এপ্রিল ২০২১ রানা প্লাজা ধ্বসের আট বছর স্মরণে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট-ব্লাস্ট, সেইফটি এন্ড রাইটস সোসাইটি-এসআরএস, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলস্ এবং শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরাম-এসএনএফ এর যৌথ উদ্যোগে “দুর্যোগকালীন সময়ে শ্রমিকদের সুরক্ষা : শ্রম আইন ও অন্যান্য বিধি-বিধান” শীর্ষক মতবিনিময় সভায় আজ বক্তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন।

সভাপতির বক্তব্যে ব্লাস্ট এর মুখ্য আইন উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের সাবেক বিচারক জনাব বিচারপতি মোঃ নিজামুল হক নাসিম বলেন, করোনকালীন দুর্যোগ মোকবেলায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকরা বিপদে পড়লে কিভাবে তাদের সহযোগিতা করতে হয় সেটা সকলকে ভাবতে হবে। তিনি বলেন, হাইকোর্টে মামলা পরিচালনায় একটি টিম তৈরি করে রানা প্লাজার মামলাগুলো পরিচালনা করলে মামলাগুলো অগ্রগতি হতো এবং শ্রমিকরা একটা কিছু পেতেন। আগামী দিনে শ্রমিকরা যেন তাদের ন্যায্য অধিকার পায় সে বিষয়ে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

বিলস্ ভাইস চেয়ারম্যান শিরীন আখতার, এমপি বলেন, ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগে শ্রম আইনের বিদ্যমান সমস্যা নিরসনে সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে। এর জন্য সকলকে তথ্য আদান প্রদানে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, সরকার ঘোষিত প্রণোদনা ঠিকমত সঠিক মানুষের কাছে পৌছাচ্ছে কিনা তার মনিটরিং করতে হবে। একটি মানবিক সমাজ গঠনে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান বলেন, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনা করে পূর্বের শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রগুলোকে স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে তৈরি করে অভিজ্ঞ ডাক্তারের মাধ্যমে শ্রমিকদের চিকিৎসা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। কারখানা ভিত্তিক তালিকা তৈরি করে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রদানের দাবি জানান তিনি।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের আইন কর্মকর্তা মোঃ মাছুম বিল্লাহ বলেন, করোনাকালীন সময়ে আন্তর্জাতিক মানদন্ডের আলোকে সরকার শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তৈরি পোশাক, চামড়া, পাদুকা শিল্পের দুঃস্থ্য শ্রমিকদের জন্য নগদ সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি এটিকে আরো সার্বজনীন করতে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

লেবার কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি সেলিম আহসান খান বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনা এবং অতিমারী করোনাকে একসাথে দেখলে হবে না, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মনুষ্য সৃষ্ট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য ভিন্ন ভিন্ন আইন থাকা প্রয়োজন বলে তিনি অভিমত ব্যাক্ত করেন। একইসাথে তিনি শ্রম আইনের বিভিন্ন ত্রুটির কথা (শ্রমিক ছাঁটাই, লে-অফ ইত্যাদি) উল্লেখ করে তা সংশোধনের বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান।

সংবিধান এবং শ্রম আইনের বিধি বিধানের কথা উল্লেখ করে মূল প্রবন্ধে সেইফটি এন্ড রাইটস সোসাইটি’র নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনা দিবস টি এখন শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তিনি উল্লেখ করেন শ্রমিকরা করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির বিরূপ পরিস্থিতিতেও নিয়মিত কাজে যোগদান করছেন, জীবনের চেয়ে জীবিকা যেন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান করোনাকালীণ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত ও আইনগত সুরক্ষা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরী। দুর্যোগকালীন সময়ে শ্রমিকদের আইনগত সুরক্ষা জোরদার করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সামাজিক সুরক্ষা। তিনি শ্রমজীবী মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষার পরিধি বৃদ্ধি, শিল্প মালিক কতৃক বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি এবং জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, দূর্যোগ অবস্থা ঘোষণা করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ, শ্রম আইন ও সংশ্লিষ্ট তফশিল সংশোধন, শ্রমিকদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ, ক্ষতিপূরণের নির্দিষ্ট মানদন্ড প্রণয়নের সুপারিশ প্রদান করেন।

অন্যান্য বক্তারা দুর্যোগকালীন সময়ে শ্রমিকরা আইনী সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত উল্লেখ করে বক্তারা ত্রিপক্ষীয় কমিটি থেকে প্রতিনিধি নিয়ে একটি কমিটি করে শ্রম আইনে দুর্যোগকালীন সময়ের জন্য নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত করার দাবি জানান। একইসাথে করোনার অযুহাতে শ্রমিকদের যেন চাকুরিচ্যুত না করা, কারখানা লে-অফ না করা সহ শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা বলয়ে অন্তর্ভূক্ত করার দাবি জানান তারা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক জনাব খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এর সঞ্চালনায় সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন ব্লাস্টের উপ-পরিচালক (আইন) জনাব মোঃ বরকত আলী। আরো বক্তব্য রাখেন লেবার কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি জনাব এ কে এম নাসিম, শ্রম আদালতের আইনজীবী জনাব আমিনা দেওয়ান শিল্পি, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের আইন কর্মকর্তা মোঃ মাছুম বিল্লাহ, বিলস্ পরিচালক কোহিনূর মাহমুদ এবং নাজমা ইসয়াসমীন, ব্লাস্টের অ্যাডভোকেসি ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিং এর উপদেষ্টা মোঃ তাজুল ইসলাম, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর রাজশাহীর উপমহাপরিদর্শক মোঃ মাহফুজুর রহমান ভূইয়া, শ্রমিক নেতা জেড.এন.এম কামরূল আনাম, সিরাজুল ইসলাম রনি এবং শাহিদা পারভীন শিখা প্রমুখ।

Comments


আর্কাইভ