ঢাকা বুধবার, আগস্ট ৫, ২০২০



সংকটাপন্ন শ্রমিকদের মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে দায় নিতে হবে রাষ্ট্রকেই

আব্দুল আলিম: বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করা করোনা ভাইরাস নিয়ে বাড়ছে বাংলাদেশেও। প্রায় মহামারীর আকার ধারণ করেছে দেশে। সংকট মোকাবেলায় লকডাউনে কার্যত প্রায় স্থবির পুরো দেশ। এতে মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব পড়ছে৷ এসবের মাঝেও সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি তৈরী পোশাক শিল্পে। কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল হয়েছে। কার্যাদেশ থাকলেও সেসব কাজ করায় রয়েছে স্থগিতাদেশ। করোনা মোকাবেলায় সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির সাথে তাল মিলিয়ে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বেশিরভাগ পোশাক শিল্প কারখানা।

কয়েক ধাপে বন্ধ ঘোষণায় অসামঞ্জস্যতা থাকায় শ্রমিকদের মাঝে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। সাত কর্মদিবসের মাঝে বেতন পরিশোধে আইনে বাধ্যবাধকতা থাকলেও শেষমেষ সেটা গড়িয়েছে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত। সরকারের নিদের্শনায় ১৬ এপ্রিলের মাঝে সকল কারখানায় মার্চ মাসের বেতন পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০% কারখানায় বেতন পরিশোধ করা হয়নি। কার্যত শ্রমিক বিক্ষোভ ও শ্রমিক অসন্তোষের খবর আসছে নিয়মিত। সময় মতো বেতন না পেয়ে শ্রমিকরা যেমন দুবেলা অন্নের জোগানে ব্যর্থ হয়েছে তেমনি ভবিষ্যত দিনের কথা ভেবে তারা শঙ্কিত, আতঙ্কিত। বিভিন্ন কারখানায় ঢালাও ভাবে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। শ্রমিক ছাঁটাইয়ে সরকারের নিষেধাজ্ঞা আর মালিক সংগঠনগুলোর আহ্বান থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছু কারখানায় শ্রমিক ছাঁটায়েঁর সংবাদ ব্যথিত করেছে। করোনায় আসন্ন ভয়াবহ বিপর্যয়ের সময় মালিকদের শ্রমিক শোষণের এমন আচরণ দুঃখজনক।

তৈরী পোশাক শিল্পকারখানার সংকট মোকাবেলায় সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। প্রণোদনার টাকায় শ্রমিকদের আগামী তিন মাসের বেতন পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখানেও রয়েছে সমন্বয়হীনতা। শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের ক্ষেত্রে নির্দেশনা থাকলেও এই প্রণোদনার অর্থে কর্মকর্তাদের বেতন পরিশোধে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে এ খাতে কর্মরত কয়েক হাজার মানবসম্পদ, কমপ্লায়েন্সসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা শঙ্কায় রয়েছে। সময় মতো বেতন মিলবে কি না তার ভরসা পাচ্ছে না। চাকরী হারানোর আতঙ্কে রয়েছে হাজারো কর্মকর্তা।

বিভিন্ন মেয়াদের সরকারী সাধারণ ছুটির সাথে তাল মিলিয়ে ছুটি ঘোষণা করলেও অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ লে অফ ঘোষণা করেছে। কিন্তু সম্প্রতি কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ থেকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে পাঠানো একটি চিঠিতে সকল কারখানাকে লে-অফ ঘোষণার আওতায় আনার জন্য সুস্পষ্ট নিদের্শনা চেয়েছেন। ফলে এটা ধরেই নেয়া যাচ্ছে যে, সকল ফ্যাক্টরী লে-অফের আওতায় বন্ধ হতে যাচ্ছে। আর এতে এক বছরের কম সময় ধরে চাকরী করা শ্রমিকরা বেতন ভাতার আওতার বাইরে চলে যাবে। লে-অফের সময়ে তারা বেতন-ভাতা পাবেন না। ধারণা করা হচ্ছে, লে-অফের ফলে প্রায় দশ লক্ষাধিক শ্রমিক কার্যত বেতন ভাতার আওতার বাইরে চলে যাবে। যাদের জীবন ধারণের শেষ অবলম্বনটুকুও আর অবশিষ্ট থাকবে না। লে-অফকালীন সময়ে বেতন ভাতা না পেলে এসব শ্রমিকরা পরিবার নিয়ে অমানবিক জীবন যাপন করবে।

আইনের আশ্রয়ে নেয়া মালিকদের লে অফের সিদ্ধান্তে এসব শ্রমিকদের জীবনে নেমে আসা ভয়ানক সংকটে রাষ্ট্রকেই এদের দায়িত্ব নিতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে করোনার প্রভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের সহায়তা প্যাকেজে পোশাক খাতের ক্ষতিগ্রস্থ শ্রমিকদের জন্য বিশেষভাবে বরাদ্ধ নিশ্চিত করতে হবে। আইনের ব্যাখ্যা, ঠেলাঠেলি, গালাগালি, দোষারোপ যাই করি না কেন, তাতে ভুক্তভোগী শ্রমিকের কোন কাজে আসবেনা।

তারা পোশাক শ্রমিক, কিন্তু এই দেশের নাগরিক তো। তারা যেখানে ভোটার সেখানে তারা থাকেন না। যেখানে থাকেন সেখানে ভোটার না। তাই সরকারি সহায়তার কোন তালিকায় এদের নাম আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

আইনের আওতায় এক বছরের কম চাকরির সময়কাল যাদের, তারা কিছুই পাচ্ছে না লে-অফকালীন সময়। কেউ কেউ মানবিক কারনে শ্রমিকদের সাহায্য সহযোগিতা করবেন। যারা পাবেন না, তাদের ক্ষুধা তো আইন মানবে না। তারা কারখানায় কাজ করেন, কিন্তু তারাও প্রান্তিক। তাদের সংখ্যা কম নয়। প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ শ্রমিক এই ক্যাটাগরিতে পড়বেন বলে ধারনা করা হচ্ছে। তাদের তালিকা পাওয়া খুব সহজ। প্রতিটি কারখানা থেকেই তাদের তালিকা পাওয়া সম্ভব। তাই বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সহ সংগঠনগুলি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলে হাজার হাজার কোটি টাকার সহায়তা বাজেটে নতুন শ্রমিক, প্রান্তিক শ্রমিক ও সহসাই মানবিক সংকটে পড়া মানুষগুলি একটু আশার আলো দেখতে পারে। বেঁচে থাকতে পারে।

এছাড়া যে সব মালিকগণ লে-অফকৃত সময়েও বেতনের আওতায় বাইরে থাকা শ্রমিকদের দায়িত্ব নিয়েছে বা নিবে তাদের পরবর্তীতে বিশেষ প্রণোদনায় আওতায় আনা যেতে পারে। এই সময়ে মালিকদের শ্রমিক বান্ধব হওয়া এখন মানবিক দাবী।

মূল কথা হল, পোশাক শ্রমিকদের দায়িত্ব মালিকদের ওপর ছেড়ে দিয়েছি আমরা। কিন্তু মালিকরা এদের দায় না নিলে রাষ্ট্রকেই এদের দায়িত্ব নিতে হবে। তারা তো শুধু শ্রমিক নয়, এ দেশের মানুষও। তারাও নিম্ন আয়ের মানুষ। আইন তাদের সুরক্ষা দিতে না পারলে রাষ্ট্রকেই বিশেষ ব্যবস্থায় এদের সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। সরকারের ঘোষিত প্যাকেজে তাদের অধিকার আছে।

করোনায় এমন সংকটময় সময়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে হলে শ্রমিকদের সুরক্ষা দিতে হবে। রাষ্ট্র, মালিক ও শ্রমিকের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই সংকট মোকাবেলা করতে হবে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়া এসব শ্রমিকদের দায় নিতে হবে।

মালিক-শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারি সকলে এক সাথে বাঁচলেই বাঁচবে শিল্প, বাঁচবে রাষ্ট্র। সংকট মোকাবেলায় আসুন বাঁচি এক সাথে।

লেখক: সম্পাদক, দি আরএমজি টাইমস

Comments


আর্কাইভ