ঢাকা বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২১



যে মেশিনে ফুল ফোঁটে

এম. মাহবুব আলম: শিরোনাম দেখে হয়ত অনেকেই ভাবছেন, মেশিনে আবার ফুল ফোঁটে? তবে লেখার গভীরে প্রবেশ করলে মূল বিষয়ের ধারণা পাওয়া যাবে। লেখার উপজীব্য পাওয়া গিয়েছে গত ১ জানুয়ারি ২০১৮ ও আজ ১ জানুয়ারি ২০১৯, ইংরেজী নববর্ষের দিন।

মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের অন্যতম হচ্ছে পোশাক। নিজের ইজ্জৎ আব্রু ঢেকে রাখার আধুনিক সভ্যতার নাম পোশাক, এটি আধুনিক সভ্যতার অন্যতম বাহনও। পোশাক মানুষকে আলোকিত করে, শালীনতা বজায়ের মাধ্যমে রুচির বহিঃপ্রকাশ ঘটে পোশাকের মাধ্যমে। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় ড্রেসকোড দেয়া হয় যাতে সবাই সমান, কোন ভেদাভেদ নেই মানুষেরই মাঝে এটি বোঝানোর জন্য। আবার হোটেল, রেস্তোরায় পোশাক দেয়া হয় নির্দিষ্ট কাউকে বোঝানোর জন্য। পোশাকের ব্যবহার আজ সার্বজনীন।ফারসি কবি ও সাহিত্যিক শেখ সাদি লিখেছিলেন  “পোশাকের গুণ” নামক একটি গল্প।আমরা তাতে উপলব্ধি করেছি পোশাকের গুনাগুণ।

সব মানুষ পোশাক পরিধান করে আবার কিছু মানুষ সেই পোশাক তৈরী করে। বাংলাদেশে এই পোশাক তৈরি যুগযুগ ধরে, তবে পোশাক তৈরি করে যে রপ্তানি করা যায় এবং তার মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায় সেই ধারণাটি আসে ১৯৭৮/৭৯ সালে। মাত্র বার হাজার ডলারের পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তা আজ ২৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির শিল্প। এর মধ্যে মিশে আছে কত চড়াই-উৎরাই আর ঝক্কি-ঝামেলার কথন। বলা বাহুল্য তবে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়গুলো মিশে আছে তা হচ্ছে ভালবাসা, ভালোলাগা আর চরম মমত্ববোধ। বাংলাদেশে পোশাক তৈরি ও রপ্তানির সাথে উল্লেখযোগ্য এবং অধিক মাত্রায় জড়িয়ে আছে নারীদের কথা। দেশের পোশাক শিল্পে প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লাখ শ্রমিক সরাসরি পোশাক তৈরির সাথে জড়িত যার ৬৫/৭০% হচ্ছে নারী। তারা সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে বিকালবেলা বা সন্ধ্যাবেলা বাসায় ফেরেন। প্রতিদিনের এই কর্মযজ্ঞের মধ্যেই তাদের জীবন যেন চলে স্বাভাবিক গতিতে। প্রত্যেকেই যেন একটা মেশিন তবে জীবন্ত মেশিন, যাদের নিপুণ হাতের ছোয়ায় তৈরি হয় আধুনিকতার অন্যতম বাহন- পোশাক। তবে এত পরিশ্রম আর কর্মযজ্ঞের মধ্যেও বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে তাদের সহাস্য উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয় তাদের প্রশান্তির পরশের কথা। যেমন গত বছর (২০১৮) ১ লা জানুয়ারি ইংরেজি নববর্ষের দিনে চোখ আটকে গিয়েছিল কিছু দৃশ্য দেখে তার মধ্যে একটি দৃশ্য চোখ আর মনকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সেদিকেই, ছবিতে যার কিছুটা ফুটে উঠেছে বাকিটা স্বচক্ষে দেখলেই অনুধাবন করা যায়।

এটা কোন ফুলের গাছ নয়,এই মেশিনে ফুল ফোঁটেও না।তবে এই মেশিনে ভালবাসা জন্মে, ভালোলাগা জন্মে, সুনিপুন হাতের ছোঁয়ায় জন্ম হয় ‘মেড ইন বাংলাদেশ’র। কতটুকু ভালবাসা থাকলে, মনের ইচ্ছাশক্তি থাকলে এতো শ্রমের পরেও দিতে পারে এই প্রশান্তির পরশ। হ্যা, বলছি সেইসব সেলাই দিদিমণিদের কথা, যাদের অফুরন্ত ভালোলাগায়, নিজের সন্তানের মতো ভালবাসায় আর কোমল হাতের পরশে বিশ্বের বুকে ঠাঁই করে নিয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয়কৃত রপ্তানিকারক পণ্য “তৈরি পোশাক”,যার সবচেয়ে বড় গর্বিত অংশীদার এই সেলাই দিদিমণিরা। এযেন ভালোলাগা, ভালবাসা আর মমত্ববোধের এক অভাবনীয় মিশেল, যে মিশেলেই আজ মহীরুহের ন্যায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প। অভ্যুদয়! হ্যা,অভ্যুদয়ই বলছি। অভ্যুদয় ঘটেছে মেড ইন বাংলাদেশের। আজ ঘুরে দাঁড়ানোর বাংলাদেশের অন্যতম অংশীদার এই পোশাক খাত। বাংলাদেশের প্রতিটা খাতে যার ছোঁয়া রয়েছে আর যার গর্বিত অংশীদার এই সেলাই দিদিমণিরা।

শিরোনামে বলেছিলাম যে মেশিনে ফুল ফোটে, হ্যা আসলেই এই মেশিনে ফুল ফোটে। প্রতিদিন হাজার হাজার লক্ষ কোটি ফুল ফোঁটে। এইসব সেলাই দিদিমণিদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় যে পোশাক তৈরি হয় তা শুধু একেকটি পোশাক নয়, একেকটি ফুল যেন ফুটন্ত গোলাপ। ফুল যেমন কলি থেকে ফোঁটে তেমনি এই মেশিনের কলি থেকেও তৈরি হয় পোশাক একেকটি ফুলের মত, যা দিয়ে শতফুল ফোটাই আমরা সর্বত্র কেননা এই ফুলের সুঘ্রাণেই বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ ভারসাম্যপূর্ণ। এই ফুলের সুঘ্রাণেই মাথাপিছু আয় বিশ বছর আগের প্রায় দ্বিগুণ, এই ফুলের সুঘ্রাণেই আজ নারীর মর্যাদা অন্য উচ্চতায়।

একসময় ভাবা হত সেলাই শুধু নারীদের কাজ কিন্তু আজ বাংলাদেশের পোশাক খাত প্রমাণ করেছে পুরুষরাও পারে সেলাইয়ের কাজ। তাই সেই সেলাই দাদাভাইদের কথাও বলতে হয়, যাদের অবদানও কিন্তু কম নয় এই ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ সম্মানে। এই মেশিনে ফুল ফোঁটানোর গর্বিত অংশীদার তাই তারাও।

এই গর্বিত অংশীদারের অন্যতম অংশীদার বাংলাদেশের পোশাক খাতের উদ্যোক্তা তথা বিনিয়োগকারীরা, যাদের অন্যত্র ঘাম ঝরানো আয়ের অর্থ বিনিয়োগ করেছেন এই ফুল ফোঁটানো মেশিনে। তাই তারাও এই মেশিনে ফুল ফোঁটানোর অন্যতম গর্বিত অংশীদার।

সকল প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে যাক পোশাক খাত এই কামনায় উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি বাংলাদেমের পোশাক শিল্পের। সাবাস বাংলাদেশ, সাবাস সেলাই দিদিমণি/দাদাভাই। বেঁচে থাকুক “মেড ইন বাংলাদেশ”।

লেখক – এম. মাহবুব আলম
ম্যানেজার (এইচ আর এন্ড কমপ্লায়েন্স)
ইউনিফর্ম টেক্সটাইল লিমিটেড

Comments


আর্কাইভ