ঢাকা বুধবার, ডিসেম্বর ১২, ২০১৮



ইন্টারভিউ নেওয়ার কিছু জরুরী কৌশল

মোঃ ওয়ালিদুর রহমান বিদ্যুৎ:


ন্টারভিউ কী করে এটেন্ড করতে হয়, কীভাবে সুন্দর করে কথা বলতে হয়, কীভাবে আদব লেহাজ দেখিয়ে চলতে হয়, কীভাবে নম্র ও স্মার্টলী ফেস করতে হয়-মানে একজন ইন্টারভিউইকে কীভাবে সবরকম দিক হতে সতর্ক করা সম্ভব, তার হাজার হাজার ভিডিও বা টেক্সট পাবেন নেটে। এসব দেখে দেখে আমার কাছে মনে হয়, সর্বতভাবে একজন ইন্টারভিউইকে মোটামুটি মুরগীর মতো থাকতে হয় বা থাকতে শেখানো হয়। কিংবা অনেকটা ফাঁসীর আসামীর মতো। যেন, একটু এদিক সেদিক হলে ইন্টারভিউয়ার মাইন্ড না করে বসেন, তার কোনো একটা খুঁত বের করতে না পারেন। ইন্টারভিউয়ার থাকেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতোন। যা মনে চায় তা করবেন, জিজ্ঞেস করবেন, এমনকি তিনি চাইলে ইন্টারভিউ বোর্ডে বসেই বগল চুলকাতে পারেন (হাসবেন না, নিজে দেখেছি।) অথচ ইন্টারভিউই হাঁচি আসলেও এমনভাবে চেপে থাকে, হাঁচির বায়ু চাপতে গিয়ে পশ্চাৎবায়ু নির্গত হয়ে বসে। অনেকটা এমন, যেন প্রার্থী সেখানে তার কর্মদক্ষতা ও জ্ঞানের প্রমান দিতে যাননি, গেছেন তার আদব লেহাজের পরীক্ষা দিতে। হায় দেশ! কবে এদেশে একজন ইন্টারভিউয়ার বা এইচআর অফিসার তার সামনে বসা প্রার্থীর জব সংক্রান্ত যোগ্যতা, জ্ঞান ও দক্ষতার বাইরে অন্য কিছুর দিকে নজর দেয়া বন্ধ করবে? কবে এদেশে ইন্টারভিউইকে বাড়ির নতুন বউয়ের মতো চোরের চাকর হয়ে না থেকে আত্মসম্মানের সাথে, ব্যক্তিত্বের ও হ্যাডমের সাথে ইন্টারভিউ দেবার মতো পরিবেশ তৈরী হবে? ইন্টারভিউ কীভাবে দেবেন-তা নিয়ে তো প্রচুর কনটেন্ট আছে। একটু দেখি, কীভাবে ইন্টারভিউ নিলে চাকরীপ্রার্থীদের যন্ত্রনা একটু হলেও কমবে।
আমি এই ছোট্ট লেখাটি বিশেষ একজন মানুষের অনুরোধে তার জন্য প্রথমে লিখি। তিনি লেখাটি তার একটি বিশেষ কাজে ব্যবহার করবেন। আমার বিশ্বাস, তার ওই কাজের মধ্য দিয়ে অনেক মানুষ উপকৃত হবে। তার দেয়া একটি ছোট ড্রাফটকে আমার নিজস্ব ধারনা দিয়ে রিফ্রেজ করার অনুরোধ করেছিলেন তিনি। লিখতে গিয়ে দেখি বেশকিছু গুরুত্বপূর্ন দিক আমি লিখতে পেরেছি। আমার ওই বন্ধুবরের অফিশিয়াল কাজে লাগার ফাঁকে আমি আমার পাঠকদের জন্য শেয়ার করলাম। হয়তো আপনাদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যাদের কাজে লাগবে। তবে লেখার মূল ক্রেডিট, আমাকে লেখানোর ক্রেডিট ওই ভাইয়ের। এই লেখাটি তিনি অবশ্যই তার মিশনে কাজে লাগাতে পারবেন বিনা দ্বিধায়।

১। প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট পদে লোক নেবার রিকুইজিশন, পারমিশন, জব ডেসক্রিপশন, স্যালারী রেঞ্জ, অরগানোগ্রাম আগে হতেই ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ‍অনুমোদন করিয়ে রাখা।

২। ইন্টারভিউ এর বিস্তারিত পরিকল্পনা করা। স্থান, সময়, ইন্টারভিউয়ার লিস্ট ইত্যাদি প্রস্তুত ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবহিত করা।

৩। ইন্টারভিউয়ের প্রশ্ন, উত্তর, স্কোর বেঞ্চমার্ক তৈরী রাখা। ভাইবা, রিটেনের সব পেপার, স্কোরশীটসহ ইন্টারভিউ সংক্রান্ত সব কাজ ডকুমেনটেড রাখা।

৪। কমপক্ষে ২টি মাধ্যমে প্রার্থীকে জানানো। সেটা হতে পারে-মোবাইল মেসেজ/ইমেইল/ফোন কল। কমপক্ষে ২ দিন সময় দিয়ে প্রার্থীকে ডাকা। সম্ভব হলে সকালের দিকে প্রার্থীকে ডাকা।

৫। মেসেজ/মেইল বা ফোন কল-যেটাই করুন, তখন তার প্রার্থীত পদের নাম, কোম্পানির নাম, ঠিকানা, ইন্টারভিউ এর তারিখ, সময়, রিপোর্টিং টাইম, রিটেন নাকি ভাইভা হবে, কোন ডকুমেন্ট আনতে হবে কিনা তা জানানো। সম্ভব হলে আপনার প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট আইডি, গুগল ম্যাপের লোকেশন ও একজন দায়ীত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কনটাক্ট তাকে দিয়ে দেয়া।

৬। ইন্টারভিউয়ের সিকোয়েন্স ও কন্টিনিউয়েশন যতটা পারা যায় কমানো। একদিন শেষ করতে পারলে বেস্ট। বিশেষ করে প্রার্থীকে যদি দূর কোনো স্থান হতে আসতে হয়। সম্ভব হলে শুক্রবারে ইন্টারভিউ আয়োজন করলে আপনি রেসপন্স ও সাকসেস বেশি পাবেন।

৭. প্রার্থী আসামাত্র তাকে রিসিভ করা। সঠিক সময়ে ইন্টারভিউ বোর্ড বসানোর ব্যবস্থা করা। প্রতি প্রার্থীর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করা।

৮। চাকরি প্রার্থীদের জন্য হালকা রিফ্রেশমেন্টের ব্যবস্থা করা। যেমন- বিস্কুট, কেক, চা-কফি ইত্যাদি। একাধিক প্রার্থী থাকলে তাদের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ডাকা। যাতে সময়ের অপচয় ও অপেক্ষার সময় কম লাগে।

৯। ইন্টারভিউ খুব লম্বা বা অতি সংক্ষিপ্ত না করা। দীর্ঘ হতে বাধ্য হলে, লাঞ্চ বা ডিনারের ব্যবস্থা করা।

১০। নারী প্রার্থী হলে, তাকে কোনোভাবেই একক ইন্টারভিউয়ারের হাতে না ছাড়া। তাছাড়া তার বিদায়ের সময়টা নিরাপত্তার জন্য হুমকী মনে হলে, সম্ভবমতো গাড়ির ব্যবস্থা করে দেয়া।

১১। প্রার্থীকে ডাকার সময়ই তার সম্ভাব্য জব কন্ডিশন ও পাওনাদির প্যাকেজ নিয়ে ধারনা দিয়ে রাখলে উভয় পক্ষের সময় বাঁচে।

১২। ইন্টারভিউ বোর্ডের সদস্যদের মূল্যায়ন আলাদা আলাদাভাবে ডকুমেন্টেডভাবে নেয়া। তারপর সেটার গড় করা। যাতে কোনো একজনের মূল্যায়ন বেশি প্রাধান্য না পায়।

১৩। প্রতিষ্ঠানের সব সিভি ও ইন্টারভিউ রেকর্ডের একটি ডাটাবেস মেইনটেইন করা। যাতে অতীতের যেকোনো প্রার্থীর যেকোনো ইন্টারভিউ রেকর্ড যাঁচাই করা যায়। প্রয়োজনে ওয়েবসাইট বা জব পোর্টালের মতো প্রযুক্তির সাহায্য নেয়া যেতে পারে।

১৪। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনির্বাচিতদের মেইলে বা মোবাইলে চাকরি প্রার্থীদের ফিডব্যাক জানানো। সম্ভব হলে তাদের রিজেক্ট হবার কারনসহ।

১৫। বাংলাদেশের রাস্তার ট্রাফিক জ্যামের কথা মাথায় রেখে সময়ানুবর্তিতার বিষয়টিকে যৌক্তিক নজরে দেখা উচিৎ।

১৬। প্রতিটি প্রার্থী, তার বিভাগ, কাজের প্যাটার্ন, পদের ওজনভেদে আলাদা ধরনের প্রশ্নের সমাহার করা উচিত। ইন্টারভিউয়ারেরও যথেষ্ট গবেষনা, পড়াশোনা ও বিশ্লেষনের দরকার আছে।

১৭। ইন্টারভিউ চলাকালীন স্মার্টফোন বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ করানো। আর যাতে প্রার্থীরা রিটেন দেবার সময় ফোনে কথা বলতে বা প্রশ্নপত্রের ছবি তুলতে না পারেন, তা নিশ্চিত করা।ৱ


লেখক: HR/Admin প্রোফেশনাল, Mgt এ্যাডভাইজার, ক্যারিয়ার/সোশ্যাল কাউন্সেলর এবং লেখক


 

Write a comment

Print Friendly, PDF & Email

এই বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ



error: Content is protected !!