ঢাকা মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৮



প্রতিবছর ২৬ কোটি ঘনমিটার বর্জ্য পানিতে

ডেস্ক রিপোর্ট: প্রতিবছর বস্ত্র ও পোশাক শিল্পের ২৬ কোটি ঘনমিটার বর্জ্য পানিতে পড়ছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বস্ত্র শিল্প অধ্যুষিত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুর অঞ্চলগুলোর নদী ও পানি সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার হচ্ছে। পোশাক শিল্প থেকে নির্গত পানির কারণে গাজীপুরের অনেক গ্রাম এবং ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধ এখন মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে। এছাড়া শীতলক্ষ্যা নদী দূষণের কারণে ওই অঞ্চলে দূষিত পানি ব্যবহার করার ফলে মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ড. মহিদুস সামাদ খান। বণিক বার্তার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, দেশের বস্ত্র ও পোশাক শিল্পে পানি শোধনের জন্য ফিজিক্যাল ও কেমিক্যাল— এ দুই ধরনের পদ্ধতিই বেশি ব্যবহার হয়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এ দুই ব্যবস্থার কার্যকারিতা তেমন দেখা যায় না। এক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে বায়োলজিক্যাল পদ্ধতি। পোশাক পণ্যের বিদেশী ক্রেতারাও তাই চাইছেন। কারণ এ ব্যবস্থায় পানি শোধন মনিটরিং দীর্ঘমেয়াদে করা যায়। অর্থাৎ কতদিন ধরে পানি শোধন চলছে বা বন্ধ আছে তা শনাক্ত করা সম্ভব এ ব্যবস্থায়।

‘ইভ্যালুয়েশন অব প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার ওয়েস্ট ওয়াটার ইম্প্যাক্টস অব টেক্সটাইল ডায়িং ইন্ডাস্ট্রিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। প্রচলিত ব্যবস্থায় কারখানা পরিচালনা করা হলে ২০২১ সাল নাগাদ বস্ত্র শিল্পের মাধ্যমে কী পরিমাণ বর্জ্য পানি উত্পন্ন হবে, তা দেখানো হয়েছে এ গবেষণায়।

বুয়েটের এ গবেষণায় বলা হয়, পরিবেশের ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে বস্ত্র শিল্পে ব্যবহূত পানি ও সেখান থেকে নিঃসরিত বর্জ্য।

ছবি-ইকোওয়াচ

এ শিল্পের কারখানায় উৎপাদিত প্রতি ইউনিট কাপড়ে ভালো মাত্রায় পানির ব্যবহার হয়। এর প্রভাবে ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ ব্যাপক হারে কমছে। আবার পোশাক শিল্প-কারখানা থেকে নির্গত পানি কোনো পরিশোধন ছাড়াই নদী ও শুকনো জমিতে গিয়ে মিশছে। এ অপরিশোধিত বর্জ্য পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের পোশাক শিল্প বিশেষ করে টেক্সটাইল ডায়িং কারখানাগুলো প্রচলিত ব্যবস্থায় বর্জ্য শোধন করে ২০২১ সাল নাগাদ ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যে পৌঁছতে পৌঁছতে পানি দূষণের মাত্রা ভয়াবহ রূপ নেবে। আর এর প্রভাব শনাক্ত করাই ছিল এ গবেষণার লক্ষ্য।

২০১৬ সালে ২১ কোটি ৭০ লাখ ঘনমিটার এবং পরের বছর ২৩ কোটি ৮০ লাখ ঘনমিটার বর্জ্য নিঃসরণ হয়েছে এ শিল্প থেকে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, চলতি বছর শেষে বস্ত্র শিল্পের বর্জ্য পানির পরিমাণ দাঁড়াবে ২৬ কোটি ৩০ লাখ ঘনমিটার। ২০২১ সালে এটি ৩৪ কোটি ঘনমিটার ছাড়াবে।

গবেষণায় ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বস্ত্র শিল্পের দূষণ প্রবণতা বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এক দশকের দূষণের পরিমাণ ও মাত্রা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্পের কারখানায় ১৮ কোটি টন কাপড় উৎপাদন হয়েছে, যার মাধ্যমে উৎপাদিত বর্জ্য পানির পরিমাণ ছিল ২১ কোটি ৭০ লাখ ঘনমিটার। প্রচলিত ব্যবস্থায় শিল্প-কারখানা পরিচালিত ২০২১ সালে এ বর্জ্য পানির পরিমাণ ৬০ শতাংশ বেড়ে গিয়ে হবে ৩৪ কোটি ৯০ লাখ ঘনমিটার। যদিও যথাযথ প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বর্জ্য পানির পরিমাণ ২৩ শতাংশ কমানো সম্ভব বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণার জন্য করা সমীক্ষায় দেশের বিভিন্ন শিল্প অধ্যুষিত এলাকার নয়টি কারখানার পানির ব্যবহার এবং পণ্য উৎপাদন পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা হয়েছে। ছয় মাসে এ কারখানাগুলোর পানির ব্যবহার ও পণ্য উৎপাদন বিবেচনায় দেখা গেছে, প্রতি কেজি পণ্যে ১২০ লিটার পানির ব্যবহার হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১১ সালে নিট শিল্প থেকে উত্পন্ন বর্জ্য পানির পরিমাণ ছিল ৭ কোটি ৫০ লাখ ঘনমিটার। ওই বছর ওভেন শিল্পের উত্পন্ন বর্জ্য পানির পরিমাণ ছিল ৭ কোটি ঘনমিটার। ২০১৭ সালে নিট শিল্পের উত্পন্ন বর্জ্য পানির পরিমাণ ১১ কোটি ৪০ লাখ ঘনমিটার, ওভেন পণ্য থেকে উত্পন্ন বর্জ্য পানির পরিমাণ ছিল ১২ কোটি ৪০ লাখ ঘনমিটার। ২০২১ সালে নিট ও ওভেন পোশাক থেকে উত্পন্ন বর্জ্য পানির পরিমাণ হবে যথাক্রমে ১৬ কোটি ৭০ লাখ ও ১৮ কোটি ২০ লাখ ঘনমিটার। এ হিসাবেই ২০২১ সাল নাগাদ বর্জ্য পানির পরিমাণ হবে ৩৪ কোটি ঘনমিটারের বেশি।

বস্ত্র পণ্যের রপ্তানি পরিমাণও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতি ইউনিট বস্ত্র পণ্যে ব্যবহূত পানির পরিমাণ এবং উৎপাদন ধারাবাহিকতার তথ্য যাচাই-বাছাই করে বস্ত্র ও পানির ভবিষ্যৎ উৎপাদন প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। পানির কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর (কেপিআই) বিশ্লেষণ করে বস্ত্রের বার্ষিক পানি নিঃসরণ ও ভবিষ্যৎ পানি দূষণের পরিমাণ হিসাব করা হয়েছে। ২০০৬ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত রফতানি তথ্য বিশ্লেষণে এ শিল্পের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১০ শতাংশ ধরা হয়েছে। প্রচলিত ব্যবস্থায় ডায়িং পদ্ধতি এবং ২০২১ সাল নাগাদ পোশাকের রপ্তানির লক্ষ্য বিবেচনায় নিয়ে বস্ত্র শিল্পের তরল বর্জ্য উৎপাদনের বার্ষিক প্রবৃদ্ধিও ১০ শতাংশ ধরা হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, পানি শোধন ব্যবস্থা থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এ ব্যবস্থা অকার্যকর থাকে। ফলে দেশে পানি দূষণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো কার্যকর হয়ে উঠতে পারেনি। পরিবেশ দূষণের দায়ে গত ২৩ আগস্ট গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীর আটটি প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বস্ত্র শিল্পটি পোশাক খাতের বড় শক্তির ক্ষেত্র এবং শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ। পানি দূষণ নিট বা ওভেন যেটাতেই হোক তা দেশের সার্বিক পরিবেশের জন্য কাম্য নয়। আধুনিক শিল্পোদ্যোক্তারা কেউই এখন আর গতানুগতিক পদ্ধতিতে পানি শোধন করেন না। ভবিষ্যৎ দূষণ যাতে এড়ানো যায়, সেজন্য উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি কার্যকর তদারকি ব্যবস্থাও আশা করছি। তাছাড়া ক্রেতারাও এখন পরিবেশের বিষয়ে অনেক সচেতন।

বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প খাত বস্ত্র ও পোশাক। দূষণের মাত্রাও এখাতেই বেশি।

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প হিসেবে বস্ত্র ও পোশাক শিল্পের দূষণ মাত্রা বেশি। প্রতি বছরই এ খাতে বর্জ্যের পরিমাণ বেড়ে চলেছে। দূষণের দায়ে জরিমানাও বেশি গুনতে হয় এ খাতের উদ্যোক্তাদের। তবে বর্তমানে এ শিল্পে পরিবেশ সচেতনতা অনেক বেড়েছে। অনেক কারখানাতেই উন্নত প্রযুক্তির পানি শোধন ব্যবস্থা রয়েছে।

Write a comment

Print Friendly, PDF & Email

এই বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ



error: Content is protected !!