ঢাকা মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৬, ২০১৮



মানব সম্পদ/কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা: চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা

এম. মাহবুব আলম: বাংলাদেশ এর গার্মেন্টস যা আরএমজি নামে খ্যাত, সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশকে দিয়েছে মেইড ইন বাংলাদেশের খ্যাতি। ৩৮ বছরের প্রাপ্তবয়স্ক এক শিল্প খাত, একটি দেশের রপ্তানীর ৮০% আসে যে খাত থেকে সেই শিল্প গার্মেন্টস শিল্প এবং এটি একটি দেশের জন্য কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে নিশ্চয়ই অর্থনীতির অ আ ক খ বুঝতে হয় না। দেশের প্রায় ৪০ লক্ষ লোক প্রত্যক্ষভাবে এই সেক্টরে কর্মরত, প্রায় সম সংখ্যক রয়েছে পরোক্ষভাবে। এই প্রত্যক্ষ ৪০ লক্ষের একটি বৃহৎ অংশ নারী, যাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয় আধুনিকতার অন্যতম বাহন পোশাক আর সেই কারণেই তারা পেয়েছে সেলাই দিদিমনির মর্যাদা। দেশের পুরুষদের একটি বড় অংশও রয়েছে এই পোশাক তৈরির সাথে। আর এদের সবার সমন্বয়েই বাংলাদেশকে দিয়েছে সারা পৃথিবীতে মেড ইন বাংলাদেশ এর পরিচিতি। আর কেউ কেউ তাই বলেন মেড ইন বাংলাদেশ উইথ প্রাইড, কিন্তু যাদের কথা খুব বেশি একটা বলা হয়না বা হিসেবে ধরা হয়না সেই প্রশাসন, মানব সম্পদ ও কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তাদেরও অবদান কম নয়। বিশেষ করে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির সাথে তাল মেলাতে এবং ক্রেতাদের আচরণ বিধি বাস্তবায়নে তারাই রাখেন সবচেয়ে বড় ভূমিকা।

এ বিষয়ে বলার আগে সর্বাগ্রেই বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের যাত্রা, অগ্রগতি ও বর্তমান অবস্থান নিয়ে কিছুটা বলা প্রয়োজন। ১৯৭৯/৮০ সালে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানি খাতে প্রবেশ করে বলে জানা যায়, সেই ৭৯/৮০ সাল থেকে আজ ২০১৮ মোট ৩৮ বছরের একটি সময় যে সময়টিকে আমরা কয়েকটি দশক বা স্তরে ভাগ করতে পারি, যেমন – ১) ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ = প্রোডাকশন, ২) ১৯৯০ থেকে ২০০০ = কোয়ালিটি – প্রোডাকশন, ৩) ২০০০ থেকে ২০১০ = কমপ্লায়েন্স – কোয়ালিটি – প্রোডাকশন, ৪) ২০১০ থেকে ২০১৮ চলমান = সুপার কমপ্লায়েন্স – কমপ্লায়েন্স – কোয়ালিটি – প্রোডাকশন।

আরো বলা যায় সেই ১৯৮০/৮১ সালে যখন পোশাক রপ্তানি খাতে প্রবেশ করে তখন ক্রেতা বা বায়াররা শুধু উৎপাদনের উপরই গুরুত্ব দিতো, কোয়ালিটি বা কমপ্লায়েন্স নিয়ে তখন খুব হিসেবনিকেশ ছিলোনা। এই সুযোগে কিছু দুষ্ট বুদ্ধির দুষ্টু প্রকৃতির লোক মানহীন পোশাক রপ্তানি করার চেষ্টা করলো, অবশেষে রপ্তানি শুরুর প্রায় দশ বছর পরে ১৯৯০ সালের দিকে ক্রেতারা গুণগত পোশাকের গুরুত্ব অনুধাবন করে কোয়ালিটি চেকিং সিস্টেম বা মান পরীক্ষা করে পোশাক ক্রয়ের দিকে গুরুত্ব দিলো অর্থাৎ কোয়ালিটি সম্পন্ন পোশাক উৎপাদনের পথে যাত্রা শুরু করলো বাংলাদেশের পোশাক খাত।, এর মানে এই নয় যে এর আগে মান সম্পন্ন পোশাক রপ্তানি হয়নি, না অবশ্যই হয়েছে কিন্তু ঐযে দুষ্ট প্রকৃতির লোক! এভাবে ২০০০ সাল পর্যন্ত কোয়ালিটি প্রোডাকশন দিয়ে এগিয়ে গেলো বাংলাদেশের পোশাক খাত। পোশাক রপ্তানির বিশ বছর পরেই প্রশ্ন আসলো ন্যায্য পারিশ্রমিক, আইনগত ও ন্যায়সংগত সুযোগ সুবিধা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা সহ বিভিন্ন বিষয়ের। ক্রেতা বা বায়াররা বলতে শুরু করলো শুধু কোয়ালিটি সম্পন্ন পোশাক রপ্তানি করলেই হবেনা, সেই পোশাক উৎপাদনের সাথে যারা জড়িত তাদের সুযোগ সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে আর এইসব সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার জন্যই নিয়ে আসলো “কমপ্লায়েন্স” নামে একটি শব্দ যেটি শুধু একটি শব্দ নয়; এটি একটি ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থায় শ্রমিক পাবে ন্যায্য সুযোগ সুবিধা, মালিক পাবে ন্যায্য শ্রম এবং নিশ্চিত হবে উৎপাদিত পণ্যের নিরাপত্তা ও গুণগত মান। এরপর ২০১০ থেকে বিশেষ করে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পরে কমপ্লায়েন্স নতুনরূপে আবির্ভূত হলো, সেই পণ্যের নিরাপত্তায় CTPAT GSV ACCORD ALLIANCE ILO থেকে শুরু করে আজকের HIGG নতুন কমপ্লায়েন্স যুগের সূচনা। এজন্যেই বলা হয়েছে সুপার কমপ্লায়েন্স। তাই বর্তমানে শুধু উৎপাদন করলেই কারখানা প্রতিষ্ঠা করা যায়না, প্রতিষ্ঠা করার আগেই কমপ্লায়েন্স নিয়ে ভাবতে হয় অর্থাৎ কমপ্লায়েন্স থাকলেই কেবল একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করা বা চালু করা সম্ভব।

প্রশ্ন তাহলে কমপ্লায়েন্স কি? কমপ্লায়েন্স একটি ইংরেজি শব্দ যার বাংলা অর্থ সম্মতি ,মেনে নেয়া বা আদেশানুসারে। আরেকটু বিস্তারিত বললে বলা যায় – ক্রেতা বা বায়ারদের আদেশ অনুসারে অথবা যথাযথ কর্তৃপক্ষের আদেশ অনুসারে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক আইন অনুস্মরণ করে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, আইন অনুযায়ী সুযোগ সুবিধা যথাযথভাবে প্রদান ও কারখানার নিরাপত্তা বিধান এবং উৎপাদিত পণ্যের নিরাপত্তা বিধানে সম্মতি প্রদান করাই হচ্ছে কমপ্লায়েন্স। অর্থাৎ বাংলাদেশের পোশাক শিল্প প্রবেশ করলো নতুন যুগে, নতুন যুগের নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন নতুন নিয়মকানুন, যুক্ত হলো নতুন কিছু ব্যবস্থা আর এই চ্যালেঞ্জ ও নতুন ব্যবস্থার প্রয়োজনে প্রয়োজন দেখা দিলো কিছু উচ্চ শিক্ষিত লোকের, এর আগেও শিক্ষিত লোক এই সেক্টরে ছিলোনা তা নয় তবে কমপ্লায়েন্স ইস্যু আসার পরেই এই খাতে শিক্ষিত লোকের প্রবেশ অনেক বেড়েছে সে কথা বলাই বাহুল্য। প্রয়োজন দেখা দিলো এদের বসার ব্যবস্থার, কেউ সিঁড়ির নীচে কেউ লিফট এর পাশে কেউবা চিলেকোঠায় (বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই এর উন্নতি হয়েছে) এভাবেই যাত্রা শুরু হলো বাংলাদেশের কমপ্লায়েন্স এর সাথে সাথে পারসোনাল বা এইচ আর বিভাগ কেউ কেউ যাকে আগে টাইম সেকশনও বলতো কেননা তারা আসা যাওয়ার টাইম নিয়ন্ত্রণ করেন।

এতক্ষণ যে বর্ণনা দিলাম যদি কারো দ্বিমত থাকে এই সেক্টরে যারা শুরু থেকে জড়িত তাদের সাথে কথোপকথনে প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠবে।

যাই হোক মূল প্রতিপাদ্যে আসি, এই উচ্চ শিক্ষিত লোকদের প্রবেশে যে এই সেক্টর খুব উচ্চ শিখরে পৌঁছে যাবে বিষয়টি এমন নয় তবে মানহীন পোশাক খাতের মান যে বেড়ে যাবে বা গিয়েছে সেটা অনস্বীকার্য। যদিও তিনি কিছু নির্দিষ্ট কাজ করবেন যেমন, বায়ারের আচরণবিধি বাস্তবায়ন করবেন,কখনো কখনো বায়াররা কিছু কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট চেয়ে থাকেন সেগুলো এনে দিতে হবে যেমন BSCI, WRAP, SEDEX, ICS, OEKOTEX, ISO আরো কত কি, স্থানীয় কিছু সংস্থা যারা কিছু নিয়মকানুনে দৌড়ঝাঁপ করেন কখনো ইচ্ছে করলে আদালতের বারান্দায় দাঁড় করাতেও পারেন তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবেন। কিন্তু সবই হবে মালিক যেভাবে চাইবেন সেভাবে। তবে কাজ কিন্তু এখানেই সীমাবদ্ধ নয় টয়লেটে পানি আছে কিনা, দুর্গন্ধ আসছে কিনা, ফ্লোর ঠিকভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আছে কিনা, নিডেল গার্ড মেশিনে আছে কিনা সাথে আই গ্লাস, মাস্ক পরছে কিনা, এয়ার প্লাগ লাগিয়েছে কিনা,শ্রমিকদের এই দাবী সেই দাবী দক্ষতার সাথে সেই দাবীর বিপরীত বুঝানো,এই বিচার সেই বিচার আরো কত কি!

কিন্তু মালিক পক্ষ বা যাদের সাথে এই কমপ্লায়েন্স এর শিক্ষিত লোকেরা কাজ করেন সেই উৎপাদনের লোকেরা কিন্তু এতো কাজ মনে করেন না, তারা মনে করেন প্যান্টশার্ট ইন করা পায়ে সুজুতো কখনো কখনো টাইও পরেন শুধু ঘুরে বেড়ায় আরকি, এদের আবার কি কাজ তবে যখনই কোন বায়ার অডিট বা কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট অডিট আসে তখন এদের গুরুত্বের শেষ থাকেনা, এইতো কয়েকদিন আগে একজনের কাছে শুনলাম গ্রুপ অফ কোম্পানীর নতুন ফ্যাক্টরীর জন্য র্যাপ গোল্ড সার্টিফিকেট চাই কিন্তু কিভাবে? কমপ্লায়েন্স ম্যানেজারকে বলা হলো এনে দিতে হবে কিভাবে জানিনা কেননা নতুন বায়ারের চাহিদা, যেকথা সেই কাজ ম্যানেজার সাহেব নেমে গেলেন গোল্ড এর খোঁজে প্রায় দুইমাস খেটেখুটে দিন নেই রাত নেই এমনকি রাত দুইটা পর্যন্তও নাকি কাজ করেছেন আবার পরেরদিন সকাল ছয় টায় বাসা থেকে বের হয়েছেন, এভাবে কাজ করে গোল্ড সার্টিফিকেট এনে দিলেন কিন্তু কিছুদিন পরেই যেকোন প্রসঙ্গে মালিক বললেন কি এতো কাজ আপনার?

এ প্রসঙ্গে কয়েকদিন আগে ফেইসবুকে পাওয়া একটি কথোপকথন মনে পরে গেলো – মালিকের কাছে একজন কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা গিয়েছেন স্যার আমার বেতন বাড়াতে হবে আমার সংসার চলছেনা, মালিক বললেন কি এতো কাজ করেন আপনি যে বেতন বাড়াতে হবে? কয়েকদিন পরে একই কর্মকর্তা গেলেন স্যার আমাকে বাড়ি যেতে হবে জরুরী প্রয়োজনে আমার কয়েকদিন ছুটি লাগবে, শুনে মালিক বললেন আপনি ছুটিতে গেলে আপনার এতো এতো কাজ এগুলো কে করবে শুনি? আপনি না থাকলে কারখানা কিভাবে চলবে যেন কারখানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিই এই কমপ্লায়েন্স/মানব সম্পদ কর্মকর্তা।

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়েছে, এখন বেশীরভাগ কর্মকর্তারাই এসি রুমে বসেন, সবাই সম্মানের চোখেও দেখেন কিন্তু বেতন কাঠামোর তেমন কোন উন্নতি হয়েছে বলে মনে হয়না বিশেষ করে নতুন নিয়োগ পাওয়াদের ক্ষেত্রে।

পোশাক খাতের জন্য নতুন মজুরী কাঠামো আসছে, ইতমধ্যেই সবাই জেনে গেছে ন্যুনতম মজুরী ঘোষণা করা হয়েছে আট হাজার টাকা, খুবই ভালো সংবাদ কেননা এর প্রয়োজন ছিলো, বর্তমান বাজার মূল্যে খুব বেশী নয় সেটি বলাই বাহুল্য তবে সদ্য আঠারো পেরনো সংসারের দায়িত্ব এখনো কাঁধে না ওঠা (কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে) একজন বালিকা/বালক এর জন্য একেবারে কম নয় যেখানে গ্রাজুয়েশন পাঠ চুকানো সদ্য কাজে যোগ দেয়া কমপ্লায়েন্স/মানব সম্পদ/কল্যাণ কর্মকর্তা একটি সংসারের পুর্ণ দায়িত্ব নেয়া একজন পূর্ণ বয়স্কর জন্য চাকরীতে প্রবেশের বেতন এখনো দশ/এগারো হাজার টাকায়ই রয়ে গেছে। নতুন মজুরী গেজেটে তাদের পদ বেতন থাকবে বলে মনে হয়না কেননা বিগত দিনে ছিলোনা, আরএমজি সেক্টরে মানব সম্পদ/কমপ্লায়েন্স/কল্যাণ কর্মকর্তা পদ সৃষ্টি হয়েছে প্রায় বিশ বছর হতে চললো এখনো কোন মজুরী গেজেটে তাদের নাম ওঠেনি যদিও এরমধ্যে দুটি মজুরী গেজেট এসেছে আরেকটি আসি আসি করছে, ২০১৫ এর বিধিমালায় কল্যাণ কর্মকর্তা নিয়ে কিছু বলা থাকলেও শুধু তার শিক্ষাগত যোগ্যতা আর কাজ লিখে দিয়েই শান্তি, তার বেতন কাঠামো কি হবে নিয়োগ প্রক্রিয়া কি হবে এ সম্বন্ধে কিছু বলা নেই, এই সুযোগে মালিক পক্ষও ইচ্ছেমত যে যা পারছে দিচ্ছে। মজুরী গেজেটে কেন এই পদবী এবং তাদের জন্য বেতন কাঠামো রাখা যায়না এবং হচ্ছেনা তা বোধগম্য নয়, সংশ্লিষ্ট যারা আছেন তারা ভবিষ্যতে অবশ্যই ভেবে দেখবেন বলে আশা করছি।

একথাও সত্য যে যদি আরএমজি কে সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা, ক্রেতার চাহিদা ও আন্তর্জাতিক বিশ্বে সুনাম আর গর্বের সাথে উচ্চারণ করতে হয় তাহলে এই মানব সম্পদ ও কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তারাই হবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।

সবকিছুর পরেও আশার আলো হচ্ছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন হচ্ছে, এখন আরএমজির অনেক প্রতিষ্ঠানেই মানব সম্পদ/কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন, কেউ কেউ কোম্পানীর নীতিনির্ধারনী পর্যায়েও কাজ করছেন এটি আশার দিক তবে সবাইকে মনে রাখতে হবে সবকিছুর চেয়েই মাথার দাম বেশী, কায়িক পরিশ্রমের চেয়ে অবশ্যই মেধার পরিশ্রমের মূল্য বেশী, তাই শিক্ষার মূল্যায়ন তথা মেধার মূল্যায়ন হোক সর্বত্র।

লেখক: ম্যানেজার (মানব সম্পদ ও কমপ্লায়েন্স), ইউনিফর্ম টেক্সটাইল লিঃ

Write a comment

Print Friendly, PDF & Email

এই বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ



error: Content is protected !!