ঢাকা বুধবার, ডিসেম্বর ১২, ২০১৮



আরএমজি সেক্টরের ন্যুনতম মজুরী, শিক্ষা ও কিছু কথা

এম. মাহবুব আলম: বেতন বা মজুরী খুবই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, একজন কর্মীর একটি নির্দিষ্ট মেয়াদান্তের আয় কেই বেতন বা মজুরী বলে। সেই বেতন বা মজুরী এমনই হওয়া উচিৎ যা দিয়ে তার নিজের এবং তার উপরে যারা নির্ভরশীল তাদের ন্যুনতম চাহিদাগুলো মিটিয়ে বেচে থাকা যায়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত পোশাক শিল্প, দেশের প্রায় ৫০ লক্ষ শ্রমিক প্রত্যক্ষভাবে এই খাতে নিয়োজিত আরো অন্তত ৫০ লক্ষ পরোক্ষভাবে জড়িত। এই প্রত্যক্ষভাবে জড়িত শ্রমিকদের একটি অংশ রয়েছে খুবই অনভিজ্ঞ এবং অদক্ষ, এই অনভিজ্ঞ এবং অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য মূলত ন্যুনতম মজুরী কেননা অভিজ্ঞদের জন্য আলাদা আলাদা গ্রেড বা মজুরী কাঠামো রয়েছে অর্থাৎ আজ যিনি কাজে যোগদান করেছেন তিনিই এই ন্যুনতম মজুরী বা বেতন পাবেন (মন্ত্রীর ভাষ্যমতে) যদিও শেষ মজুরী গেজেটে ট্রেইনী বা প্রশিক্ষণার্থী নামে একটি পদ ছিলো, তিন/ছয় মাস পরে যারা ন্যুনতম গ্রেডে যুক্ত হতো, যদিও কিছু শর্ত বিদ্যমান। যাইহোক প্রশ্ন এই ন্যুনতম মজুরী বা বেতন নিয়েই,গত কয়েকদিন আগে শ্রম প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের আরএমজি খাতের ন্যুনতম মজুরী বা বেতন ঘোষণা করেছেন ৮০০০/- টাকা যদিও গেজেট এখনো হয়নি তবে এটাই হবে তা নিশ্চিত, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার ও বাংলাদেশের বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে এই মজুরী বা বেতনও যথেষ্ট নয় বলে অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন এবং কথাও সত্য, যদিও পোশাক খাতের বিনিয়োগ কারীরা বলেছেন এটা তাদের জন্য অনেক বেশি এবং দেয়াও তাদের জন্য কষ্টকর হবে, একথাও সত্য কেননা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে শ্রমের মূল্য বাড়লেও বাংলাদেশের পোশাকের দাম খুব একটা বাড়েনি কিছুকিছু ক্ষেত্রে কমে গেছে যারা এর সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত তারা ভালো জানেন বিশেষ করে যারা এই পোশাকের মূল ব্যবসা করেন সেই বায়াররা শ্রমিকদের মজুরী, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিয়ে বড়বড় কথা বললেও এই শ্রমিকদের জন্য তাদের কোন অবদান নেই, শুধু বলে আর চাপিয়ে দিয়েই খালাস, সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে মজুরী বৃদ্ধির পরে তারা যে পোশাকের তৈরি মূল্য বাড়িয়ে দিবেন তা কিন্তু মনে হয়না কেননা ২০১৩ সালের পরে বাড়িয়ে দেননি একথা অনেকেই জানে।

যাইহোক আমি আমার মূল প্রতিপাদ্যে আসি, সেটি হচ্ছে এই ন্যুনতম মজুরীকে কিভাবে শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্য, সংগতিপূর্ণ এবং একত্রিত করা যায়, যেমন বাংলাদেশে বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক তবুও অনেক ছেলেমেয়ে ই প্রাথমিক শিক্ষা পাঠ সমাপ্ত করেনা বলে বহু জরিপে এবং আমাদের জানামতেও রয়েছে তাই এই ন্যুনতম মজুরীও পারে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা এবং মাধ্যমিক শিক্ষাকে আরো একধাপ এগিয়ে নিতে।

কিভাবে??? বলছি – যদি ন্যুনতম মজুরী ঘোষণায় কিছু মানদণ্ড মেনে চলা যায় বা নির্ণয় করা হয় তাহলেই শিক্ষার কিছুটা হলেও মূল্য দেয়া বা শিক্ষা ও কর্ম একত্রিত করা যায়।

এর প্রথম পদক্ষেপ বা মানদণ্ড হচ্ছে ন্যুনতম বেতনকেও তিনটি গ্রেডে ভাগ করা, যেমন – ১) অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন থেকে চতুর্থ শ্রেণী, ২) পঞ্চম শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেনী, ৩) নবম শ্রেণী থেকে দশম/এসএসসি পাশ।

এই তিন গ্রেডে যদি ন্যুনতম মজুরী বা বেতনকে ভাগ করা যায় তাহলে শিক্ষাখাতও আগাবে, শ্রমিক পাবে তার মান অনুযায়ী ন্যায্য মজুরী এবং মালিকও পাবে ন্যায্য মজুরীর ন্যায্য শ্রম।

আরো বিষদ ভাবে বলছি – যেমন বর্তমানে ন্যুনতম মজুরী করা হয়েছে ৮০০০/- টাকা, এটাকে যদি তিন গ্রেডে ভাগ করে এভাবে করা যায় – গ্রেড ১) অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন থেকে চতুর্থ শ্রেনী – ৬০০০/- টাকা, গ্রেড ২) পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেনী ৭০০০/- টাকা এবং গ্রেড ৩) নবম থেকে দশম/এসএসসি ৮০০০/- টাকা, তাহলে শিক্ষার মূল্য এবং সঠিক জনবল নিয়োগ দুটোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে কেউ কেউ যদি মনে করেন ৮০০০/- টাকা সর্বনিম্ন ঠিকই থাকবে তাহলে ৮০০০/৯০০০/১০০০০ এভাবেও করা যায়।

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন যে এই ন্যুনতম মজুরী বা বেতনধারীরা তো একই কাজ করে তাহলে বেতন একই নয় কেন, যারা পোশাক খাতের সাথে জড়িত তারা ভালোভাবেই জানেন এই ন্যুনতম মজুরী বা বেতন ধারীদের সাধারণত সহঃ অপারেটর বা হেলপার বলা হয়।

এদের সকলের কাজ প্রায় এক কিন্তু পুরাপুরি এক না, যেমন কিছু লোক সুতা কাটে কিছু লোক আনা নেয়া করে কিছু লোক নাম্বার ম্যাচিং করে এরকম আরো অনেক, এখানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিছুটা স্বল্প শিক্ষিত লোকের প্রয়োজন রয়েছে আর কাজ ভেদে তাদের বেতন টাও কিছুটা ব্যবধানের হওয়া উচিৎ তাহলে তাদের যোগ্যতাকে সঠিক মূল্যায়ন করা হবে কেননা শিক্ষাও একটা যোগ্যতা এবং এতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়বে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে কিভাবে নিরুপন করা যাবে যে কে প্রাথমিক পাশ কে মাধ্যমিক পাশ, এটি অত্যন্ত সহজ কেননা বর্তমানে পিএসসি জেএসসি এসএসসি সব ক্লাসেই সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে, অতএব যারা সার্টিফিকেট প্রদান করতে পারবে তাদেরকেই এই সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা যাবে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে এর কর্মসংস্থানের কোন সম্পর্ক নেই, যেমন কেউ বলে এটাকে এক মুখী শিক্ষা, যে দেশের একটি খাতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক জড়িত সেই খাতের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে যথাযথ কোন ব্যবস্থা নেই, সেটা কারিগরি থেকে ইনষ্টিটিউট পর্যন্ত তাই চাকরির শুরুতেই মজুরী বা বেতনের তারতম্য বা পার্থক্যই পারে সেই এক মুখী শিক্ষাকেই কিছূটা এগিয়ে নিতে নাহলে পিতামাতা শুধু সন্তানের বয়স ১৮ নিয়েই চিন্তা করবে তার শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করবেনা। তবে এই ব্যবস্থা শুরু করলেই ফলাফল পাওয়া যাবেনা, ফলাফল পেতে অন্তত ৫/১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে তবে সেটা বেশি সময় নয়।

ন্যায্য শ্রম ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত হোক ন্যায্য মানদণ্ড।

লেখক – ম্যানেজার (মানব সম্পদ ও কমপ্লায়েন্স), ইউনিফর্ম টেক্সটাইল লিঃ

Write a comment

Print Friendly, PDF & Email

এই বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ



error: Content is protected !!