ঢাকা, আজ বুধবার, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, এখন রাত ১২:৪৭

অ্যাকর্ড, এলায়েন্স, উৎস কর আর আমাদের পোশাক শিল্প; যেন বড় অন্যায়ই করেছে বিনিয়োগকারীরা

শুধু কি শ্রমিকের মানবেতর জীবনের কথাই বলবো? অতি রক্ষণশীল এই সমাজের অর্ধেকই নারী। এই নারীদের আজ রাস্তা দেখিয়েছে কে? আজ কোন খাতে ৮০ ভাগ শ্রমিক নারী? সে এই পোশাক খাত। এই পোশাক খাতে যারা ঝুকি নিয়ে বিনিয়োগ করল, শত বাধা পেরিয়ে আজ দেশকে সম্মানজনক অর্থনৈতিক পর্যায়ে নিয়ে আসলো তাদের কি শুধুই কাঠগড়ায় দাঁড় করাবো?

আব্দুল আলিম : আমরা সবাই আদরের ঘরের দুলাল না হলে ছোট বেলায় আমাদের অনেকেরই আটার জাই/জাও বা গমের ভাত খাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে কিংবা অপেক্ষাকৃত দরিদ্রদের খেতে দেখার অভিজ্ঞতা আছে। এইতো সেদিনও কাজের অভাবে উত্তরবঙ্গের মঙ্গার কথা শুনতে পেয়েছি। জয়নুল আবেদিনের ছবি থেকে জেনেছি কেমন ভয়াবহ ছিল দুর্ভিক্ষের দিনগুলি। সেই দুর্ভিক্ষ আজ জাদুঘরে। না খেয়ে মানুষ মরা এখন শুধুই ইতিহাস। এসব সফলতার কৃতিত্ব যারা দাবি করতে পারে তাদের প্রথম সারিতে কার নাম বলবেন? আপনি যদি অন্ধও হন বা পোশাক খাতের চরম শত্রুও হন তবু আপনাকে স্বীকার করতে হবে আমাদের পোশাক খাতই সবচেয়ে বড় ভুমিকা রেখেছে আজকের বাংলাদেশ থেকে দুর্ভিক্ষ নামক শব্দটি মুছে দিতে এবং নতুন এক উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতে। অনভিজ্ঞ তরুণ উদ্যোক্তা আর অদক্ষ শ্রমিকের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা শ্রমের কারনেই আজ আটার জাই, গমের ভাত, মঙ্গা কিংবা দুর্ভিক্ষকে জাদুঘরে স্থান দিতে পেরেছি আমরা।

শ্রমিকরা কোন রকম ডাল-ভাত, মালিকরা পাজেরো-লিমুজিন, আর কর্মকর্তারা সম্মানের সাথে মধ্যবিত্ত জীবনধারন করছেন। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, যে শ্রমিকের ঘামের পয়সায় মালিক পাজেরো-লিমুজিনে চলাচল করেন তাদের অনেকই মানবেতর জীবন যাপন করে আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রেখে চলছেন। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, শুধুই কি শ্রমিকের ঘাম? মালিকের ঘাম কি আমরা কখনও দেখব না? শুধু কি শ্রমিকের মানবেতর জীবনের কথাই বলবো? অতি রক্ষণশীল এই সমাজের অর্ধেকই নারী। এই নারীদের আজ রাস্তা দেখিয়েছে কে? আজ কোন খাতে ৮০ ভাগ শ্রমিক নারী? সে এই পোশাক খাত। এই পোশাক খাতে যারা ঝুকি নিয়ে বিনিয়োগ করল, শত বাধা পেরিয়ে আজ দেশকে সম্মানজনক অর্থনৈতিক পর্যায়ে নিয়ে আসলো তাদের কি শুধুই কাঠগড়ায় দাঁড় করাবো?

শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবি, কারখানা সংস্কারে বিশাল ব্যয়, গ্যাস- বিদ্যূত সঙ্কট, অ্যাকর্ড, এলায়েন্স এর মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি চলছে। আপাতত কোন সুখবর নেই আমাদের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই খাতে। সর্বশেষ আসন্ন বাজেটে উৎসে কর বৃদ্ধির প্রস্তাবে মনে হচ্ছে যেন বড় অন্যায় করে ফেলেছে পোশাক কারখানা মালিকরা। তাদের সমস্যা দেখার কেউ না থাকলেও, সমস্যার উপরে ঝামেলা যেন বেড়েই চলেছে।

পোশাক কর্মী মিলি আজ স্বাবলম্বী। পোশাক কারখানায় কাজ করে নিজের জন্য বাড়ী করার এক টুকরো জমি কিনেছেন, বাচ্চার জন্য একটি ডিপোজিট স্কিম খুলেছেন। কি করতেন এই মিলি যার স্বাক্ষরজ্ঞানই সবচেয়ে বড় যোগ্যতা? শ্রমিকের জীবন আরও উন্নত হওয়া জরুরী তাতে কোন সন্দেহ নাই। তাদের জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন, স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ, সম্মানজনক বেতন-ভাতা। সবই যুক্তিসঙ্গত, তবে সাধ আর সাধ্য মিলতে তো হবে। যে দেশের জনগনের বিরাট অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে সেখানে এই পুঁজিবাদী সমাজে রাতারাতি সমস্যার সমাধান কি সম্ভব? তবে যদি আমাদের অন্য যেকোন খাতের শ্রমিকদের সাথে তুলনা করা হয় তবে পোশাকযোদ্ধারা মন্দের মধ্যেই ভাল আছেন। কখনও দুচোখ বন্ধ করে ভেবেছেন, কেমন আছেন পরিবহন, পাট, কেমিক্যাল, মটর, কৃষি, গ্লাস কিংবা গৃহ শ্রমিকরা? বুকে হাত দিয়ে বলেন কেমন আছে আপনার বাসার গৃহকর্মী? তার চাকরির কি কোন নিরাপত্তা আছে? তাঁর উপর কি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্যাতিত হচ্ছে না? তাহলে দোষ কেন শুধুই কারখানা মালিকের? নিশ্চয়ই আপনার গৃহকর্মীর চাইতে ভাল আছেন পোশাক শ্রমিকরা। শ্রমিক অধিকার রক্ষার একজন সামান্য কর্মী হিসেবে মনে করি আরও অনেক উন্নয়ন প্রয়োজন শ্রমিকদের জীবনের। তবে সেই উন্নয়ন সম্ভব হবে আমাদের শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখে। যারা শুধুই শ্রমিক আন্দোলনের নামে অশান্ত করে তোলেন আমাদের এই শিল্পকে, তারা শ্রমিকের বন্ধু হতে পারে না। তারা তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থে শ্রমিকদের লেলিয়ে দিয়ে মালিকের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে শ্রমিক অধিকারের কথা ভুলে যায়। তারা আজ মালিক শ্রমিককে মুখোমুখি দাড় করিয়ে নিজ স্বার্থ লুটে নিচ্ছে।


আরও পড়ুন :  পোশাক কারখানার অনিরাপদ পরিবেশ আর শ্রমিক শোষণের জন্য ব্র্যান্ডই দায়ী


আমরা পুঁজিবাদ মেনে নিয়েছি কিন্তু তাঁর ফলাফল মেনে নিব না তা কি হয়? কথায় কথায় মালিকদের রক্তচোষা বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করি না আমরা। পুঁজিবাদ মানেই তো প্রতিযোগিতা। আর এই প্রতি্যগিতায় কেউ মালিক আর কেউ শ্রমিক। যে বেশী শক্তিশালী সেই লড়াই জিতবে। মুক্তবাজার মানেই তো দামের কোন নিয়ন্ত্রন থাকবে না। তাই তো কম দামের শ্রমবাজারে এত এত বড় বড় নামি দামি ব্র্যান্ড এর চোখ বাংলাদেশের মত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর প্রতি। উদ্দেশ্য কম মূল্যে শ্রম ক্রয়। কেন? তোমরা এত মানবতা বুঝ তাহলে আমাদের শ্রমিকদের তোমাদের দেশের মত করে মূল্য দাও না কেন? তা কেন দিবে? তারা তো মুক্তবাজার অর্থনীতির সুযোগে আমাদের ব্যবহার করতে এসেছে। তাহলে কারখানা মালিকদের প্রতি এত ক্ষোভ কেন? তাও আবার শুধুমাত্র পোশাক কারখানা মালিকদের প্রতি।


আরও পড়ুন :  আনুসাঙ্গিক সুবিধাদি বৃদ্ধিই দিতে পারে পোশাক শ্রমিকের ন্যূনতম জীবন ধারনের নিশ্চয়তা


পোশাক মালিকরা সবাই ফেরেশতা নয় তবে এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যদি পোশাক শ্রমিকদের অবদান স্বীকার করতে রাজি থাকেন তাহলে সেই শ্রমিকদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা মালিকদের অবদান নিশ্চয়ই অস্বীকার করবেন না বা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। ততটুকু স্বীকৃতি অন্তত দিন। অন্ধভাবে দোষ না চাপিয়ে মুল কারণ উৎঘাটন করে কাজ করে যেতে হবে। বাঁচিয়ে রাখতে হবে এই শিল্প।

বিশাল বাজেটের নিরাপত্তা উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পাদন করতে যখন বিনিয়োগকারীরা গলদঘর্ম ঠিক তখন মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে উৎসে কর বৃদ্ধির প্রস্তাব। আমরা যেখানে আমেরিকার কাছে জিএসপি সুবিধার জন্য ধর্না দিচ্ছি, চেষ্টা করে যাচ্ছি আমাদের পণ্যকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরও বেশি আকর্ষণীয় করতে সেখানে আমরাই আবার চাপিয়ে দিচ্ছি উৎসে করের বোঝা।

একটি পোশাক কারখানার জন্য ২ ডজনের বেশী লাইসেন্স, সার্টিফিকেট, নিবন্ধন ইত্যাদি নিতে হয়। প্রতিটির জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা ফি। কয়েক বছরের শিশুও জানে কোন জায়গা থেকেই সরকার নির্ধারিত ফি দিয়ে বিনা ঝামেলায় লাইসেন্স পাওয়া সম্ভব নয়, রয়েছে নিশ্চিত বাড়তি খরচের খাত। কেন বলছেন না তাদের কথা। মালিক কি এসব ঘর থেকে এনে দিবেন?

রানা প্লাজা ও তাজরীন ফ্যাশনের দুর্ঘটনার নেতিবাচক প্রভাবের কারনে দরকষাকষির সাহস যেমন কমে এসেছে তেমনি ক্রেতাকে আশ্বস্ত করতে বেড়ে গেছে ব্যবস্থাপনা খরচ। বিশাল বাজেটের নিরাপত্তা উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পাদন করতে যখন বিনিয়োগকারীরা গলদঘর্ম ঠিক তখন মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে উৎসে কর বৃদ্ধির প্রস্তাব। আমরা যেখানে আমেরিকার কাছে জিএসপি সুবিধার জন্য ধর্না দিচ্ছি, চেষ্টা করে যাচ্ছি আমাদের পণ্যকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরও বেশি আকর্ষণীয় করতে সেখানে আমরাই আবার চাপিয়ে দিচ্ছি উৎসে করের বোঝা। কর আমাদের দিতে হবে, কর না দিলে দেশ কিভাবে চলবে? যে দেশের মানুষ যত বেশি কর দেয় তারাই তত উন্নত। তবে উৎসে কর তো নিশ্চয়ই কারখানা মালিক জমি বিক্রি করে দিবেন না, বা জমানো টাকা থেকেও দেওয়ার কথা নয়, পণ্য থেকেই বের করতে হবে। তাই উৎসে কর যতটুকু বাড়বে, পণ্য উৎপাদন খরচে ততটুকু যুক্ত হবে, মূল্য ততটুকুই বাড়াতে হবে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হতে থাকা আমাদের পোশাক খাতের এই ক্রান্তিকালে বিদেশী ক্রেতারা যখন আরও সস্তা পণ্য খোঁজ করতে মায়ানমার বা আফ্রিকাতে চেষ্টা চালাচ্ছেন ঠিক তখন এই সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও আমাদের বড় বিপদে ফেলতে পারে।


আরও পড়ুন : অ্যাকর্ডের কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ, প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ!


আমাদের পোশাক খাতের বর্তমান প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের পণ্য দিন দিন কমে আসছে। চীন, ভিয়েতনামের এখনও আমেরিকার বাজারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে যেখানে আমাদের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক। জিএসপি এর সম্ভাবনার খবরে নেই কোন আশার বানী । শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবি, কারখানা সংস্কারে বিশাল ব্যয়, গ্যাস- বিদ্যূত সঙ্কট, অ্যাকর্ড, এলায়েন্স এর মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি চলছে। আপাতত কোন সুখবর নেই আমাদের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই খাতে। সর্বশেষ আসন্ন বাজেটে উৎসে কর বৃদ্ধির প্রস্তাবে মনে হচ্ছে যেন বড় অন্যায় করে ফেলেছে পোশাক কারখানা মালিকরা। তাদের সমস্যা দেখার কেউ না থাকলেও, সমস্যার উপরে ঝামেলা যেন বেড়েই চলেছে।

লেখক : সম্পাদক, দি আরএমজি টাইমস 

ই-মেইল : editor@rmgtimes.com

মন্তব্য লিখুন

এই বিভাগের আরও খবর

Find us on Facebook